ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন
প্রতীকী ছবি
বর্তমান অবস্থায় মনে হচ্ছে দেশ ভালো নেই, আর আমি বা আমরাও ভালো নেই! একজন দেশপ্রেমিক বিপ্লবীর কণ্ঠ স্তব্ধ করতে তাঁর মাথায় গুলি করে হত্যার পর দুটি পত্রিকা অফিসে অগ্নিসংযোগ করা হলো! ছায়ানট, উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও বাদ গেল না! আর কারা কী জন্য এসব করলেন, সে কথাটিও জলবৎ তরলং! অতঃপর প্রগতিশীল চিন্তাচেতনা নিয়ে যেন কেউ কথা বলতে না পারেন, মত প্রকাশ করতে না পারেন সেসব রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্যই যে দুটি পত্রিকার অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হলো এ বিষয়ে কারও কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। আর ছায়ানট, উদীচী আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি তো আরও পরিষ্কার। উদীচী শব্দের অর্থই যেখানে ‘উত্তর আকাশে উদিত ধ্রুবতারা’ সুতরাং সেই ধ্রুবতারার আলো দেখে কারা ভীত সে কথাটিও আমরা জানি। আবার ছায়ানটের মতো একটি বিখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীত প্রতিষ্ঠানটির প্রতি ক্ষোভ ঝাড়লেন কারা তাও আমরা বুঝতে পারি।
আমরা আরও বুঝতে পারি যে, তরুণ বিপ্লবী শরিফ ওসমান হাদির নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর কে বা কারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে নামলেন! তা ছাড়া ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যার পর তার লাশ গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্তে লিপ্ত মানুষগুলোর চেহারাও আমাদের কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার! কারণ এ ঘটনায় প্রতিবেশী দেশ ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে একহাত নেওয়ার একটি মোক্ষম অস্ত্র তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে আর ভারতও সে সুযোগ হাতছাড়া করেনি। সঙ্গে সঙ্গে একদল লোক দিল্লির সুরক্ষিত এলাকায় অবস্থিত আমাদের দূতাবাসে ঢুকে রাষ্ট্রদূতকে হত্যার হুমকি দিয়েছে, যার দায়ভার বাংলাদেশের দীপু দাসকে হত্যাকারীরা অস্বীকার করতে পারে না। অথচ অবশেষে জানা গেল যে, দীপু দাস ইসলাম ধর্মবিরোধী বা রসুল (সা.)-বিরোধী কোনো মন্তব্যই করেননি! আর তেমন কিছু সে করে থাকলেও তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়াই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তা না করে সেদিন দীপুকে হত্যার পর তার লাশ গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে কোন ধর্ম পালন করা হলো তা আমদের বোধগম্য নয়!
উল্লেখ্য, আমাদের দেশসহ পার্শ্ববর্তী ভারতে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি একটি নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে! আর বর্তমানে ভারতে একটি হিন্দুত্ববাদী সরকার ক্ষমতায় থাকায় সে দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার নির্যাতন দিনদিন বেড়েই চলেছে! এ অবস্থায় আমাদের দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা না ঘটলেও একশ্রেণির মানুষ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করায় পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিভিন্ন দেশে ভুল বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে! সে অবস্থায় আমাদের দেশেও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি বন্ধ হওয়া উচিত।
কারণ আমাদের দেশের একদল লোক, ধর্ম সম্বন্ধে যাদের সঠিক শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞান বা প্রাজ্ঞতা নেই, ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা যদি দীপু দাস হত্যার মতো ঘটনা ঘটায় সে ক্ষেত্রে একটি সভ্য দেশ ও জাতি হিসেবে পৃথিবীর বুকে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না! এসব ঘটনাকে ইস্যু বানিয়ে যারা আমাদের উন্নয়ন অগ্রগতিতে ঈর্ষান্বিত তারা সহজেই আমাদের দেশটিকে জঙ্গিবাদের আস্তানা প্রমাণ করার সুযোগ পাবে। আর এ ক্ষেত্রে ভারত সরকার তো এক পা এগিয়েই রেখেছে!
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী শক্তিশালী রাষ্ট্র। বিশাল ভারতের স্থলভূমি দ্বারা আমরা তিন দিকে পরিবেষ্টিত। তা ছাড়া আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ভারত পৃথিবীর চতুর্থতম শক্তিশালী রাষ্ট্র।
সুতরাং প্রতিবেশী সেই রাষ্ট্রটি সম্পর্কে আমাদের কৌশলী হওয়ার প্রয়োজন আছে। কারণ ভারত-বাংলাদেশ পারস্পরিক নির্ভরশীল দুটি রাষ্ট্র হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরাই ভারতের ওপর বেশি নির্ভরশীল! সুতরাং ভারত সম্বন্ধে আমাদের কথাবার্তা বা দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচক্ষণতা এবং কূটনৈতিক জ্ঞানের অভাব থাকলে ভারত তার সুযোগ গ্রহণে দ্বিধা করবে না। এ অবস্থায় ময়মনসিংহের মতো ঘটনায় ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন যুবককে এভাবে হত্যা করা সম্পূর্ণভাবে বিবেকহীন এবং সভ্যতাবিরোধী একটি কার্যকলাপ হওয়ায় ভারতের বিজেপি সরকার এবং তার দল রণহুংকারে আমাদের দূতাবাসে আক্রমণ করায় কূটনৈতিকভাবে আমরা অসুবিধায় পড়েছি! আর একশ্রেণির মোল্লার দিনরাত অর্থহীন ভারতবিরোধী গরম গরম বক্তৃতা এবং ধর্ম সম্পর্কে মানুষের মনে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টিই যে ময়মনসিংহের ঘটনায় ইন্ধন জুগিয়েছে সে বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং এই শ্রেণির মোল্লাদের এসব বক্তৃতা-বিবৃতিও বন্ধ হওয়া উচিত। এসব ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির ধর্মবিরোধী কোনো বক্তব্য যেমন আমলযোগ্য অপরাধ ঠিক তেমনি একজন অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত কাণ্ডজ্ঞানহীন মোল্লার যুক্তিহীন বা ভিত্তিহীন ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টিকারী যেকোনো বক্তব্যও আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত! কারণ ভিত্তিহীন এসব ধর্মীয় বয়ানও মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যায়, এ ধরনের অনেক ধর্মীয় কথাবার্তাও মানুষকে উত্তেজিত করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দেয়! অতএব শুধু শুধু গায়ের ঝাল মেটানোর জন্য ধর্মীয় উত্তেজনা না বাড়ানোই ভালো।
বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এসব অর্থহীন চিৎকার চেঁচামেচি, স্টান্টবাজি বন্ধ করা উচিত। আশা করি আমাদের দেশের আলেম সমাজও বিষয়টি ভেবে দেখবে। উল্লেখ্য, ওপরের কথাগুলো দ্বারা কোনোক্রমেই ভারতের শক্তিকে ভয় পাওয়ার কথা বলা হয়নি। বরং ভারতীয় বৈরিতাকে মোকাবিলার জন্য ভারতের বিষয়ে আরও বেশি কৌশলী হওয়ার জন্যই কথাগুলো বলা। জনান্তিকে এখানে বলে রাখতে চাই, বর্তমানে যেসব ব্যক্তি দিনরাত ভারতবিরোধী বক্তৃতা করেন, ভারত, ভারতের কূটনীতি, কূটকৌশল নিয়ে তাদের চেয়ে আমি আরও বেশি চিন্তাভাবনা করি বলেই ভারতের বিষয়ে আরও কৌশলী হওয়ার কথা বলেছি। কারণ সেই ১৯৭১ সাল থেকে আমি এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা, গবেষণা করে আসছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে অবস্থানকালে মওলানা ভাসানীকে গৃহবন্দি করে রাখা অবস্থায় আমরা যারা তার অনুসারী এবং রাজনীতি সচেতন ছিলাম তারা ঠিকই ভারতের মতলব বুঝে ফেলেছিলাম। আর ভারত আমাদের প্রকৃত বন্ধু কি না সে বিষয়টিও আমাদের জানা আছে। ১৯৭১ সালে নিয়াজির মার্সিডিজ গাড়িটি যেমন ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নিয়ে যেতে দেখেছি, তেমনি ১৯৭২ সালে পাবনার আবদুল হামিদ রোডের ইলেকট্রনিকসের দোকান, ঘড়ির দোকান ইত্যাদি স্থানেও ভারতীয় সেনাবাহিনীর লুটতরাজের ঘটনা দেখেছি! সুতরাং ভারতকে আমরা ভালোভাবেই চিনি। আর এত কিছু জানি শুনি চিনি বলেই বলছি, দয়া করে যেনতেন কারণে খেয়ালখুশিমতো ভারতবিরোধী এলোপাতাড়ি গরম গরম কথাবার্তা, বক্তৃতা, বিবৃতি প্রদান হতে বিরত থাকুন! কারণ এসব কথায় কাজের কাজ কিছু হয় না, বিষয়টি অনেকটা চুলকিয়ে ঘা বাধানোর মতো ঘটনা ঘটে! ভারত ভারতের জায়গায় থাকুক, আমরা আমাদের জায়গায় থাকি। আমাদের নিরাপত্তা সুসংহত করতে যা যা করার দরকার তাই করা উচিত। প্রয়োজনে সক্ষম নাগরিকদের আধাসামরিক ট্রেনিং দিয়ে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি সামরিক কোর্স বাধ্যতামূলক করে, ১ কোটি মানুষকে গেরিলা ট্রেনিং দিয়ে রাখলে বিশ্বের অনেক শক্তিই আমাদের সঙ্গে চোখ রাঙিয়ে কথা বলতে পারবে না।
বর্তমান অবস্থায় দিনরাত ভারতবিরোধী গরম গরম কথা না বলে সামনের নির্বাচনটা ভালোয় ভালোয় পার করতে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মনে রাখতে হবে আমাদের বর্তমান সরকার একটি ছোট আকারের অরাজনৈতিক সরকার হওয়ায় তারা ঠিকমতো দেশ পরিচালনা করতে পারছে না! এ অবস্থায় সবকিছু নিয়ে দিনরাত যুদ্ধংদেহি কথাবার্তা আমাদের জন্য বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে! আমরা দুর্বল একটি সরকার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছি বলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই; ফলে মাঝেমধ্যেই অঘটন ঘটে চলেছে। সামনের দিকে আরও অঘটন ঘটবে বলেই মনে হয়। কারণ অঘটনঘটনপটিয়সীরা হাত গুটিয়ে বসে নেই। এ অবস্থায় এমনিতেই আমরা ভালো নেই। দেশের ব্যবসাবাণিজ্য, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুবাতাস নেই, ব্যাংক-বিমা ধ্বংসের মুখে, পুঁজিবাজারে হাহাকার, চাষিদের মুখে হাসি নেই, দরিদ্র মানুষ আরও দরিদ্র হয়েছে, তাদের নুন আনতে পান্তা ফোরাচ্ছে! এ অবস্থায় আমাদের যে কারও বা যে কোনো সংগঠনের হঠকারী কার্যকলাপ আমাদের আরও বেশি দুঃখ-কষ্টে নিপতিত করবে! আমাদের অনৈক্য এবং দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যে কেউ আমাদের বিরাট ক্ষতিসাধন করতে পারে; নির্বাচন ভণ্ডুল করে দিতে পারে! আমাদের সবারই মনে রাখা প্রয়োজন যে, বর্তমান টালমাটাল অবস্থা থেকে একমাত্র আসন্ন নির্বাচনই আমাদের উদ্ধার করতে পারে। কারণ আমরা যে যাই বলি না কেন, নির্বাচিত সরকার ছাড়া আমাদের কোনো গতি নেই। এবারের নির্বাচনে যদি একদল অভিজ্ঞ, জ্ঞানী, গুণী, শিক্ষিত, নিষ্ঠাবান, প্রগতিশীল, নিঃস্বার্থবান, ত্যাগী, সৎ ব্যক্তিকে আমরা নির্বাচিত করতে পারি এবং তাদের হাতে যদি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত হয়, তাহলে হয়তো আমরা আবার নতুন করে বাঁচতে শিখব, নতুন করে বাঁচতে পারব! অন্যথায় এভাবে কিন্তু চলা যায় না, এভাবে বাঁচার মতো বাঁচা যায় না, মনে হয় কোথাও কেউ নেই, আর আমরাও কেউ ভালো নেই!
লেখক : কলামিস্ট, বীর মুক্তিযোদ্ধা