মিজানুর রহমান বাবুল সম্পাদক সংবাদ এই সময়।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন লড়াই-সংগ্রাম করে অনন্তলোকে চলে গেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সারা শহরে মানুষের শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানের মধ্য দিয়ে তিনি সমাহিত হলেন। ৩১ ডিসেম্বর বুধবার রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল জানাজার শহরে, যা শেষ পর্যন্ত জনসমুদ্রে রূপ নেয়। এমন বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা বাংলাদেশ কখনো দেখেনি।
আসন্ন নির্বাচনের ঠিক ৪৩ দিন আগে ৪১ বছরের সুদীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে চিরবিদায় নিলেন খালেদা জিয়া। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে তাঁর আর অংশগ্রহণ করা হলো না। অথচ তিনি তিনটি আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি যতবার যতগুলো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, ততবারই সব আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে মোট ২৩টি আসনে নির্বাচন করে প্রতিটি আসনে বিজয়ী হন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এখন আসন্ন। বেগম জিয়া দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, কিন্তু তিনি তাঁর লড়াইয়ের ফসল আসন্ন নির্বাচন দেখে যেতে পারেননি।
আসন্ন নির্বাচনের প্রক্কালে দুঃশাসনের বছরগুলোর কথাও মানুষ বিস্মৃত হয়নি।
ক্ষমতার মোহ মানুষকে কতখানি অন্ধ করতে পারে তা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জনগণ দেখেছে। কোনো কিছুকে তোয়াক্কা না করে শেখ হাসিনা তাঁর দেড় যুগের শাসনামলে নিজেকেই রাষ্ট্র মনে করতেন। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভয়াল আতঙ্ক, গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, জঙ্গি দমনের নামে মানুষ হত্যা, দুর্নীতি, লুটপাট, গায়েবি মামলা, হয়রানি, জেল-জুলুম, হুলিয়া, মানবাধিকার হরণ, বিনা কারণে চাকুরিচ্যুতি, বিরোধী মতের রাজনীতি নির্মূল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। সিভিল প্রশাসন, নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ধ্বংস করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল।
দুঃশাসন অবসানের আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তিন-তিনটি বিনা ভোটের একতরফা ও কলঙ্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, দেশ-বিদেশে যা কোনো গ্রহণযোগ্যতাই পায়নি।
তার পরও আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা দেশ শাসন করেছেন বহাল তবিয়তে। কোনো আলোচনা বা সমালোচনা তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে চুল পরিমাণ টলাতে পারেনি। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। জাতির ক্রান্তিকালে ড. ইউনূসের এই দায়িত্ব গ্রহণকে বাংলাদেশের আপামর সব শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বাগত জানিয়েছে। ড. ইউনূসের ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় ১৬ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর গত ১১ ডিসেম্বর বর্তমান নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ থাকছে। মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের রায় প্রদান করে প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশবাসী তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ লাঘব করে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পাবে। আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জবাব দিতে সাধারণ মানুষ অনেক দিন ধরে পথ খুঁজছিল। এবার সুযোগ পেয়ে জনগণ প্রকৃত ভোটের মাধ্যমে সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে।
আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী দল ছাড়া অন্য সব দল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র, সুশাসন আর জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে বলে দেশবাসী প্রত্যাশা করে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দল সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে এবার মনোনয়ন দিচ্ছে বলে আমাদের বিশ্বাস। আওয়ামী দুঃশাসনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ গুম-খুনের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হোক তার পুনরাবৃত্তি আমরা আর দেখতে চাই না।
রাষ্ট্রশাসনে আওয়ামী লীগ প্রতিটি ঘটনায় যে চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে, তা মানুষের হূদয় থেকে মুছে যাবে না। ৩৬ জুলাইয়ে সংঘটিত দেশ-কাঁপানো রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে যে হাজার হাজার ছাত্র, শ্রমিক, জনতা নিহত-আহত হয়েছিল, তা দেখে পুরো জাতিসহ বিশ্ববাসী স্তম্ভিত হয়েছে। ছাত্রলীগ-যুবলীগের লাগামহীন অস্ত্রবাজি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ দুর্বৃত্তায়নের এক শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছিল বিগত শাসনামলে। বিরোধী মত দমানোর জন্য বহু ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে জঙ্গি তকমা লাগিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ছোট-বড় অনেক দলের অংশগ্রহণে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে প্রতিটি দল তার নিজস্ব নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে জনগণের কাছে ভোট প্রার্থনা করবে। তবে এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনা, প্রেক্ষাপট ও আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনিই এখন বিএনপির কাণ্ডারি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরি তিনি।
যে অসীম দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও সততার বিরল দৃষ্টান্ত আমরা শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার মধ্যে দেখেছি, সেই একই বৈশিষ্ট্য আমরা তারেক রহমানের মধ্যে দেখতে চাই। শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়া যেভাবে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, বিদেশ থেকে সুনাম কুড়িয়ে এনেছেন, আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন, তারেক রহমান সেই একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন—এটাই প্রত্যাশিত। তাঁর উদীয়মান ও গতিশীল নেতৃত্বে দেশ সামনের দিকে ও প্রগতির পথে আরো এগিয়ে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
শহীদ জিয়া যেভাবে গ্রামগঞ্জে খাল কেটে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে, রাস্তা বানিয়ে, রাস্তার দুই পাশে বৃক্ষ রোপণ করে, তিনফসলি বা চারফসলি আবাদভূমি তৈরি করে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছেন, বিদেশে কর্মী প্রেরণ করে রেমিট্যান্স আনয়নের সূচনা করেছেন, গার্মেন্টসশিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছেন, তেমনি তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমান এই কার্যক্রমগুলো আরো প্রসারিত করবেন বলে দেশবাসীর প্রত্যাশা।
তবে পরাজিত স্বৈরাচারী সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও নেতারা পালিয়ে গেলেও তাঁদের দোসররা এখনো হুমকি-ধমকি ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আসন্ন নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করছে। তারই অংশ হিসেবে শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। ওসমান হাদি মনে করতেন, নির্বাচনই সমাধান। তাই তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। নির্বাচন বানচালের লক্ষ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করতে হাদিকে হত্যা করা হয়। এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, নির্বাচন বানচালে ষড়যন্ত্রকারীরা যথেষ্ট সক্রিয়। তবে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষসহ ফ্যাসিস্টবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকলে দেশি-বিদেশি কোনো অপশক্তি আসন্ন নির্বাচন বানচাল করতে পারবে না।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হবে, যা হবে আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের রায়। যে সরকার অংশীদারিমূলক, সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করবে। সেটি হবে প্রতিহিংসার রাজনীতির পরিবর্তে সব মত-পথের সমন্বয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন সম্ক্রীতির রাষ্ট্র। থাকবে না দুঃশাসন ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি; থাকবে একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। মানুষ যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে থাকতে পারে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।