মিজানুর রহমান বাবুল সম্পাদক সংবাদ এই সময়।
ফাইল ছবি
২৪ ডিসেম্বর ২০২৫। লন্ডন সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৭ মিনিটে বিমান বাংলাদেশের বিজি–২০২ ফ্লাইটটি যখন হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে আকাশে উড়াল দেয়, তখন তারেক রহমানের অনুভূতি কেমন ছিল? কী ভাবছিলেন রাজনীতির এই বিস্ময়মানব?
ডিসেম্বরের ইউরোপ মানেই কনকনে শীত। বিকেল গড়াতেই সূর্য মিলিয়ে যায় দিগন্তে, নেমে আসে বিষণ্ণ অন্ধকার—যা অকারণে মন ভারী করে তোলে। প্রায় দেড় যুগের সম্পর্ক যে দেশটির সঙ্গে, যে ভূমিতে বসে তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন, দীর্ঘ নির্বাসন শেষে সেই দেশটি ছেড়ে যাচ্ছেন।
কিছুটা বিষাদ থাকতেই পারে। আবার একই সঙ্গে—সতেরো বছর পর নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার তীব্র আকুলতা। আশা ও আশঙ্কার আলোছায়ায় নিশ্চয়ই আন্দোলিত হচ্ছিলো তাঁর হৃদয়, মহাসমুদ্রের ঢেউয়ের মতো।
কেমন হবে তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন? তাঁকে কাছে পেয়ে কী হবে গণমানুষের প্রতিক্রিয়া? আবেগ-উচ্ছ্বাস কি বাঁধভাঙা জোয়ারে রূপ নেবে? কেমন দেখতে পাবেন তাঁর ফেলে আসা বাংলাদেশ, স্মৃতিবিজড়িত ঢাকা শহর—এসব প্রশ্ন নিশ্চয়ই দোলাচলে রেখেছিল তাঁকে।
বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশের পর তাঁর মন যে আবেগে আপ্লুত হয়েছিল, তা সহজেই অনুমেয়। বিমান থেকে নামার পর নিজেকে সংযত রাখলেও চোখের কোণে নিশ্চয়ই জমে উঠেছিল সজলতা। বড় মানুষদের কাঁদতে নেই—এই সংযমেই হয়তো নিজেকে সামলে নিয়েছিলেন তিনি। দুঃখ, কষ্ট আর অপমান বুকে নিয়ে যে মাটি তাঁকে ছাড়তে হয়েছিলো সতেরো বছর আগে, সেই মাটির গন্ধ নিতে তিনি খালি পায়ে নেমে পড়েছিলেন বিমানবন্দরের আঙিনায়।
দুহাতে মাটি মাখিয়ে যখন নীরবে বসে ছিলেন, তখনো তিনি জানতেন না—জনসমুদ্রের প্লাবনে ভেসে গেছে ঢাকা শহর। আঠারো কোটি মানুষ তখন রাজপথ, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সমগ্র বিশ্ব প্রত্যক্ষ করছিলো অভূতপূর্ব এক দৃশ্য—ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে; বরণ করতে উতলা গোটা দেশ। তাঁকে ঘিরে কোনো কার্পণ্য নেই, কোনো কৃত্রিমতা নেই।
বিমানবন্দর থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন মঞ্চে যাওয়ার পথে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষ হাত নেড়ে, স্লোগানে স্লোগানে জানিয়ে দিলো তাদের ভালোবাসা।
আগের রাত থেকেই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো ছিল জনতার দখলে। আবাল–বৃদ্ধ–বনিতা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছে তাঁকে একনজর দেখার জন্য। কে মুসলিম, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান; কে ধনী, কে দরিদ্র—কোনো ভেদাভেদ ছিল না। পরম মমতায় বাংলাদেশ আপন করে নেয় তার মজলুম সন্তানকে। এমন ভালোবাসা পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম নেতার ভাগ্যেই জুটেছে।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান দুই হাত উঁচু করে সম্বোধন করলেন—“প্রিয় বাংলাদেশ। ” তিনি শোনাননি কোনো অলীক স্বপ্নের কথা; শোনালেন বাস্তবতার গান। দৃঢ় কণ্ঠে বললেন— “I have a plan.” মঞ্চ ছাড়ার আগেও একই প্রত্যয় উচ্চারণ করলেন আরও দু’বার। মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের অঙ্গীকারে তিনি যে অবিচল, তা স্পষ্ট করে দিলেন সেদিন।
এভারকেয়ার হাসপাতালে গমন, শহীদ জিয়ার সমাধিতে ফাতেহা পাঠ, জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন, কবি নজরুল ও ওসমান হাদির কবর জিয়ারত, নির্বাচন কমিশনে উপস্থিতি—মানুষের ঢল আর উদ্দীপনায় যেন একটি বার্তাই স্পষ্ট হয়ে উঠলো—তারেক রহমান ও বাংলাদেশ এখন সমার্থক। অবিস্মরণীয় স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে তিনি একাকার হয়ে গেলেন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে।
ঠিক তখনই মাকে হারানোর বেদনাময় ঘটনার মুখোমুখি হলেন তারেক রহমান। তিনি দেশের মাটিতে পা দেওয়ার তিন দিনের মাথায়, ৩০শে ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে, সবাইকে কাঁদিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন রাজনীতির মহান ব্যক্তিত্ব, গণতন্ত্রের মাতা, বাংলাদেশের অভিভাবক বেগম খালেদা জিয়া। তারেক রহমান স্বচক্ষে দেখলেন দেশমাতার প্রতি মানুষের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। দলমত, শত্রু-মিত্র, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ, কুটনীতিক নির্বিশেষে সবাই এসে দাঁড়ালো তারেক রহমান ও জিয়া পরিবারের পাশে।
তারেক রহমান এলেন, দেখলেন—এবার জয়ের পালা।
ঘনিয়ে আসছে বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচন। দেশবাসী চায় একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ ভোটের উৎসব। বিশেষ করে প্রথমবারের ভোটাররা, কিংবা গত সতেরো বছরে যারা ভোট দিতে পারেনি অথবা যাদের ভোটের প্রতিফলন ঘটেনি—তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তাদের মতপ্রকাশের জন্য। নিয়মের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলটির চেয়ারম্যান। মানুষের প্রত্যাশা, বিএনপি জয়লাভ করবে এবং এ দলের কর্ণধার দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। আন্তর্জাতিক পরিসরেও তাঁকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা হচ্ছে। সঙ্গত কারণেই তাঁর ওপর মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী।
তবে মানুষের চাওয়া বেশি নয়। তারা ভালো থাকতে চায়। চায় নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদা। তারা ফ্যাসিবাদের অন্ধকারে ফিরে যেতে চায় না। তারা চায় ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার, কথা বলার স্বাধীনতা এবং স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা। গুম, খুন ও নির্যাতনের যুগে ফিরে যেতে চায় না মানুষ। তারা লোভী নয়। প্রাসাদে ঘুমাতে চায় না, বিলাসিতা চায় না; দু’বেলা পোলাও–কোরমার স্বপ্নেও বিভোর নয়। তারা চায় শান্তি ও ন্যায়বিচার। মানুষ এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে গুম, খুন ও নিপীড়নের ভয় থাকবে না, মতপ্রকাশ অপরাধ হবে না এবং নাগরিক তার অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রের দ্বারস্থ হতে পারবে।
তারেক রহমান ‘I have dream’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তাঁর ‘I have a plan’ নিশ্চয়ই ন্যায়ভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, যেখানে মানুষ শান্তিতে ও নিরাপদ থাকবে। কোন সন্দেহ নেই, এ পথেই তাঁকে হাঁটতে হবে। মার্টিন লুথার কিং-এর ‘True peace is not merely the absence of tension; it is the presence of justice.’ নিশ্চয়ই তাঁর চিন্তাজগতকে নির্দেশনা দিচ্ছে।
শেষ কথায় আসি। তারেক রহমান তাঁর বিশ্বাসের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে মহানবী (সা.)–এর ন্যায়পরায়ণতার রেফারেন্স টেনেছেন। নবীর আদর্শে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার পথে এগিয়ে যেতে চান তিনি; মানুষ নিশ্চয়ই তাঁর ওপর আস্থা রাখবে। আমি যা বুঝি, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার পথে অবিচল থাকলেই তিনি জয় করতে পারবেন দেশবাসীর মন। তখন তাঁর প্রত্যাবর্তন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি হবে একটি জাতীয় রূপান্তরের সূচনা।