আন্তর্জাতিক ডেস্ক।
ইরানের তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে গতকাল গণজানাজায় অংশ নেয় হাজারো মানুষ। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দেয় -ইন্টারনেট
খামেনিবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল ইরানে হঠাৎ নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী, গতকাল এরফান সোলতানি নামে যে তরুণকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ কার্যকরের কথা ছিল, শেষ পর্যন্ত তা করা হয়নি। পরে জানানো হয়েছে, তেহরান সরকার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করেছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সুর নরম করেছেন।
তিনি দাবি করেছেন, ‘আশ্বাস পেয়েছি যে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ হয়েছে। ’
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, এ পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই দেশজুড়ে গণবিক্ষোভ স্তিমিত হয়েছে। যার কারণে তেহরান সরকার বিমান পরিষেবা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। তবে দৃশ্যত পরিস্থিতি শান্ত মনে হলেও যুক্তরাষ্ট্র একটি বিমানবাহী রণতরিসহ বড় সামরিক বহর দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নিয়ে আসছে।
গতকাল সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেপ্তার ও ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত তরুণ এরফান সোলতানির মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করেছে দেশটির সরকার। তাঁর পরিবারের সদস্য এবং নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হেনগাওয়ের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
সোলতানির আত্মীয় সোমায়েহ নামে এক নারী সিএনএনকে বলেছেন, ‘খবর পেয়েছি সোলতানির দণ্ড কার্যকর হয়নি। তবে তার দণ্ড বাতিলও হয়নি।
আমরা আরও তথ্যের অপেক্ষায় আছি। ’ পরে মানবাধিকার সংস্থা হেনগাও প্রতিবেদনে জানায়, সোলতানির মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা হয়েছে।
এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি আশ্বাস পেয়েছেন যে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, (বিক্ষোভকারীদের) মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো পরিকল্পনা নেই। ট্রাম্প বলেন, ‘পরিস্থিতি কোন পথে এগোয়, তা আমরা দেখছি।
কারণ ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র একটি খুব ইতিবাচক বক্তব্য পেয়েছে। ’
এখনো উদ্বিগ্ন ইরান : ইরানের তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক হাসান আহমাদিয়ান সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেছেন, ‘ইরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ করে দিয়েছে-ট্রাম্প একাধিকবার এমন বক্তব্য দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার শঙ্কা কমে গেছে, ইরানের সরকার এমনটা সম্ভবত বিশ্বাস করবে না। ’ তিনি জানিয়েছেন, যদিও ট্রাম্পের বক্তব্য ইঙ্গিত করছে ওয়াশিংটন উত্তেজনা হ্রাস চায়। তা সত্ত্বেও ইরানের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকবেন। হাসান আহমাদিয়ান আরও বলেন, ‘আমি মনে করি মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা বলেন তা ইরানিদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। কারণ এর আগে ইরানিরা যখন যুক্তরাষ্ট্রে সঙ্গে আলোচনায় ছিল তখন দেশটি হামলার শিকার হয়েছে। ’ যুক্তরাষ্ট্র এবারও ইরানের ওপর আচমকা হামলা চালাতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করে হাসান আহমাদিয়ান বলেন, ‘ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানে আকস্মিক হামলার আভাস আছে। ’ তিনি এও বলেন, ‘ইরানের বেশির ভাগ বিক্ষোভকারী সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করলেও তারা তাদের দেশে কখনই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা দেখতে চায় না। ’
রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র : নিউজ ন্যাশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার একটি বিমানবাহী রণতরিসহ বড় সামরিক বহর দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা করিয়েছে। খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরি। এরই মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে এটি যাত্রা করেছে। এতে রণতরির পাশাপাশি বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজ, ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট ও সাবমেরিনও রয়েছে। এ বাহিনী এক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড অঞ্চলে পৌঁছাবে। এই কেন্দ্রীয় কমান্ড এলাকা মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা এবং মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে ২১টি দেশকে, যেখানে মার্কিন ও কূটনৈতিক সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে এ রণতরি মোতায়েনের পেছনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা কাজ করছে। ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং সহিংস ঘটনার পর থেকে গৃহীত পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে ওয়াশিংটন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং প্রয়োজন হলে সামরিক সমর্থন শক্তিশালী করবে বলে বার্তা রেখেছে। আরও কিছু ঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে কিছু সামরিক কর্মী ও সেনা সরিয়ে নিচ্ছে সতর্কতাস্বরূপ। যুক্তরাষ্ট্রের রণতরি মোতায়েনে কী কার্যগত পরিবর্তন হবে তা সময়ই বলবে, কিন্তু সমগ্র অঞ্চলে নিরাপত্তা ও শক্তি ব্যালান্সের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেখা যেতে পারে।
ইরানের ক্ষমতায় কাকে পছন্দ ট্রাম্পের : ইরানের ক্ষমতায় কে থাকলে ট্রাম্পের সুবিধা, সে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই সপ্তাহের বেশি চলা ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। পরিস্থিতি এখন থমথমে। বিশেষ করে সোলতানির ফাঁসিসহ অন্য বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরান সরকার থেকে কিছু আশ্বাস পাওয়ায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ক্ষমতায় রেজা পাহলভির নাম আলোচনায় থাকলেও ট্রাম্প বলছেন, তিনি একজন ভদ্র মানুষ, কিন্তু তাকে ইরানের মানুষ পছন্দ করবে না। তিনি বলেন, ‘রেজা পাহলভি দেখতে বেশ অসাধারণ। কিন্তু আমি জানি না তিনি নিজ দেশে কতটা ভালো করবেন। আমরা ওই পর্যায়ে এখনো যাইনি। আমি জানি না তাঁর দেশ তাঁকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে কি না। যদি তারা করে, তাহলে আমার জন্য এটি ঠিক আছে। ’
ট্রাম্প গতকাল রয়টার্সকে দেওয়া এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘চলমান বিক্ষোভের কারণে তেহরানের সরকার পতনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাস্তবতা হলো, যেকোনো সরকারই ব্যর্থ হতে পারে। ’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘সরকার পতন হোক বা না হোক, সময়টা খুবই আকর্ষণীয় হতে যাচ্ছে। ’