ছবি উমংনু মারমা।
নতুন পাড়া রোয়াংছড়ি
বান্দরবান প্রতিনিধি:
আধুনিকতার দ্রুত স্রোতে যখন গ্রামবাংলার বহু ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে, তখনো নীরবে টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রাচীন তাঁতশিল্প। বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার নতুন পাড়ায় গেলে এখনো চোখে পড়ে কাঠের তৈরি হাতে চালানো তাঁত, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বুনে চলেছেন পাহাড়ি নারীরা তাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস আর জীবনের গল্প।
পাহাড়ি তাঁতশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি পাহাড়ের মানুষের পরিচয়, আত্মপরিচয়ের প্রতীক। মারমা, বম, চাকমা ও অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নারীরা ঘরের আঙিনায় বসেই রঙিন সুতোয় বুনে চলেন থামি, পিনন, খাদি, ওড়না ও নানা নকশার কাপড়। প্রতিটি নকশার ভেতর লুকিয়ে থাকে তাদের জীবনদর্শন, প্রকৃতির রং আর পাহাড়ের গল্প।
স্থানীয় তাঁতশিল্পী উমংনু মারমা বলেন,
“আমাদের মায়েরা যেমন তাঁত বুনেছেন, আমরাও তেমনই শিখেছি। কিন্তু এখন বাজারে মেশিনে তৈরি কাপড়ের ভিড়ে হাতে বোনা কাপড়ের কদর কমে যাচ্ছে। তবুও আমরা ছাড়ছি না, কারণ এই তাঁত আমাদের অস্তিত্ব।”
একসময় পাহাড়ি তাঁতশিল্প ছিল পারিবারিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আয়ের প্রধান উৎস। বর্তমানে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, বাজার সংকট এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে এই শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। অনেক তরুণ প্রজন্ম জীবিকার তাগিদে শহরমুখী হচ্ছে, ফলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প হারানোর শঙ্কা বাড়ছে।
তবে আশার আলোও আছে। পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি হাতে বোনা কাপড়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এসব কাপড় কিনে নিচ্ছেন স্মারক হিসেবে। কিছু বেসরকারি উদ্যোগ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাঁতশিল্পীদের প্রশিক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারিভাবে পরিকল্পিত সহায়তা, সহজ ঋণ, আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা এবং ডিজাইন উন্নয়নের মাধ্যমে পাহাড়ি তাঁতশিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে এই শিল্প সংরক্ষণ মানে পাহাড়ি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা।
আধুনিকতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে নতুন পাড়ার তাঁতের শব্দ যেন এখনো জানান দেয়—এই পাহাড়ে এখনো বেঁচে আছে শেকড়ের টান, বেঁচে আছে ঐতিহ্যের রঙিন সুতো।