নিজস্ব প্রতিবেদক
তারেক রহমান
আজ ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দিবসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটেছিল, যা তখনকার রাজনীতির গতিধারা পাল্টে দিয়ে দেশ ও জাতিকে নতুন পরিচয়ে অভিষিক্ত করেছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী সেনা অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে যখন চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, তখন সিপাহি-জনতার মিলিত ঐক্যের বিপ্লব দেশ ও জাতিকে অনাকাঙ্ক্ষিত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিয়েছিল।
অভূতপূর্ব সেই বিপ্লব-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সাময়িক বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন স্বাধীনতার ঘোষক তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো ৭ নভেম্বরকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বিএনপি সরকারের আমলে এই দিনটিতে সরকারি ছুটি ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার সেই ছুটি বাতিল করে।
আওয়ামী শাসনামলে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করতে পারেনি দলটি। এবার দিবসটি পালনে দলটি গত ৫ নভেম্বর থেকে আগামী ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ১০ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
দিবসটি উপলক্ষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পৃথক বাণী দিয়েছেন।
তারেক রহমান তাঁর বাণীতে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে বলেন, ‘চূড়ান্ত গণতন্ত্রের চর্চার জন্য অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত।
আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা পরিকল্পিতভাবে দেশীয় কৃষ্টি, ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসন চালাতে সুযোগ দিয়েছিল। তাই আমি মনে করি, ৭ নভেম্বরের চেতনায় সকল জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্র বিনির্মাণ করতে হবে। মানুষের মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব শুধু মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা নয়; এ দেশে আধিপত্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অভ্যুদয়ের সূচনা হয় এবং এর মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়।
দিবসটি উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘সবার সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করি। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশপ্রেমে উদ্দীপ্ত হয়ে সিপাহি-জনতা রাজপথে নেমে এসেছিল, জাতীয় স্বাধীনতা সুরক্ষা ও গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের অঙ্গীকার নিয়ে। তাই ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক বিপ্লব অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত। স্বাধীনতা-উত্তর ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী নিজ স্বার্থে দেশকে আধিপত্যবাদের থাবার মধ্যে ঠেলে দেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা চিরদিনের জন্য ধরে রাখা। সে জন্য একদলীয় বাকশাল গঠন করে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘বাকশালী সরকার চরম অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী পন্থায় মানুষের ন্যায়সংগত অধিকারগুলো হরণ করে। দেশমাতৃকার ওই চরম সংকটকালে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কুচক্রীরা মহান স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে। জাতির এই গভীর সংকটকালে ৭ নভেম্বর স্বজাতির স্বাধীনতা রক্ষায় অকুতোভয় সৈনিক এবং জনতার ঢলে রাজপথে এক অনন্য সংহতির স্ফুরণ ঘটে। এরপর স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। এই পটপরিবর্তনে রাষ্ট্রপতি জিয়ার নেতৃত্বে দেশে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়। গণতন্ত্র অর্গলমুক্ত হয়ে বাক্-ব্যক্তি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু আধিপত্যবাদী শক্তির এদেশীয় এজেন্টরা উদ্দেশ্য সাধনের পথে কাঁটা মনে করে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে পৈশাচিকভাবে হত্যা করে। জিয়াউর রহমান শাহাদাতবরণ করলেও তাঁর আদর্শে বলীয়ান মানুষ দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় এখনো ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘আবারও চক্রান্তের গোপন পথে আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা প্রায় ১৬ বছর গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে রাষ্ট্রক্ষমতা হাতের মুঠোয় রাখে। এদের নতজানু নীতির কারণেই দেশের সার্বভৌমত্ব দিনের পর দিন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াকু নেতাকর্মীদের বীভৎস নির্মমতায় দমন করেছে। আয়নাঘর, গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ দুর্নীতি ও অপশাসনের এক ভয়াল রাজত্ব কায়েম করেছিল। গণতন্ত্রের প্রতীক দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে বন্দি করে বহু বছর মুক্তি দেওয়া হয়নি। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার মহিমান্বিত আত্মদানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্টরা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। মানুষের মধ্যে গণতন্ত্রের মুক্তির পথ প্রসারিত হয়েছে।’
দিবসটি উপলক্ষে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বাণীতে বলেন, ‘সেনাবাহিনী ও সর্বস্তরের জনগণের সার্বিক সমর্থনের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। এই বিপ্লবের মূল চরিত্র ছিল জিয়াউর রহমানের প্রতি সেনাবাহিনী ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন। স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে এবং একজন নিষ্কলুষ সাহসী সৈনিক হিসেবে জিয়ার প্রতি সামরিক বাহিনী ও জনগণের ব্যাপক সমর্থন ছিল। জনগণের সমর্থনের কারণে জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বরের বিপ্লবে মহানায়কে পরিণত হন। সিপাহি-জনতার এই বিপ্লবের সম্মিলিত প্রয়াসে জনগণ নতুন প্রত্যয়ে জেগে ওঠে। ৭ নভেম্বর বিপ্লবের সফলতার সিঁড়ি বেয়েই আমরা বহুদলীয় গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথ পেয়েছি। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়েই আইনের শাসন, বাক্, ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সামাজিক শান্তি ফিরে এসেছিল।’
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আজ শোভাযাত্রা, আলোচনাসভা, ভিডিও, স্থিরচিত্র, পোস্টার, ক্রোড়পত্র প্রকাশসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। আজ দিবসটি পালনে সকাল ৬টায় নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয়গুলোতে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল ১০টায় দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের (বীর-উত্তম) মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করবেন।