মুফতি সাইফুল ইসলাম
প্রতীকী ছবি
আরবি শুধু একটি ভাষা নয়, এটি ইসলামী সভ্যতার প্রাণস্পন্দন। এই ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে পবিত্র কোরআন, বিবৃত হয়েছে হাদিস, রচিত হয়েছে তাফসির ও ফিকহের বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার। তাই আরবি ভাষা চর্চা মানে কেবল ধর্মীয় শিক্ষা নয়; বরং মুসলিম বিশ্বের আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত থাকা। বাংলাদেশে আরবি চর্চার ইতিহাসও তেমনি প্রাচীন ও গৌরবময়—যার ভিত গড়ে উঠেছিল ইসলামের আগমনের কিছু কালের মধ্যেই।
(ড. আব্দুল করিম, বাংলাদেশে ইসলামের ইতিহাস, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২০০০)।
প্রাচীন বাংলায় আরবি চর্চার সূচনা
ইসলামের প্রথম যুগেই আরব বণিকেরা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও খুলনা উপকূলে বাণিজ্য করতে এসে ইসলাম প্রচার করেন (ড. আব্দুল করিম, ২০০০)। তাঁদের মাধ্যমে আরবি ভাষা ও কোরআন পাঠের ধারা শুরু হয়। পরে সুলতানি আমলে (১২০৪–১৫৭৬ খ্রি.) বাংলায় আরবি শিক্ষা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়।
রাজধানী গৌড়, সোনারগাঁ ও বগুড়ায় গড়ে ওঠে অসংখ্য মাদরাসা ও দরসগৃহ (ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা ও আরবি ভাষা, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৭)।
গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ, আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ ও নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের দরবারে আরবি ভাষায় কবিতা রচনা হতো, কখনো কখনো চিঠিপত্রও লেখা হতো আরবিতে (ড. আব্দুল করিম, ২০০০)। এটি প্রমাণ করে, বাংলা মুসলমানদের মানসিক জগতে আরবি ছিল জ্ঞান ও মর্যাদার প্রতীক।
ঔপনিবেশিক যুগে পতন ও প্রতিরোধ
মোগল আমলেও আরবি ছিল উচ্চশিক্ষার অন্যতম ভাষা।
কিন্তু ১৮৩৫ সালে ইংরেজ শাসক ম্যাকাউলে ইংরেজিকে একমাত্র শিক্ষার ভাষা ঘোষণা করলে আরবি ও ফারসি শিক্ষার বড় ধাক্কা লাগে (ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, ১৯৯৭)। শহরাঞ্চলের মাদরাসাগুলো বিলুপ্ত হতে থাকে, তবে গ্রামীণ মক্তব-মাদরাসা ও মসজিদভিত্তিক শিক্ষা টিকে যায় জনগণের ধর্মীয় অনুরাগে (ড. আব্দুল করিম, ২০০০)।
এই সময়েই মুসলিম সমাজের ভেতর থেকে এক ধরনের নবজাগরণ দেখা দেয়—আরবি ও ইসলামি শিক্ষাকে টিকিয়ে রাখতে কওমি ধারার মাদরাসাগুলোর উত্থান ঘটে। দারুল উলূম দেওবন্দ (ভারত) এ ধারার প্রেরণার উৎস ছিল। বাংলার হাটহাজারী, পটিয়া, সোনারগাঁও, কুমিল্লা ও ঢাকা অঞ্চলে অসংখ্য মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আরবি ভাষার ধারক-বাহক হয়ে ওঠে (ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, ১৯৯৭)।
পাকিস্তান ও স্বাধীনতার পরের ধারা
পাকিস্তান আমলে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা কাঠামোতে আরবি ভাষার আনুষ্ঠানিক পাঠক্রম চালু হয় (ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, ১৯৯৭)। ১৯৫১ সালে ঢাকা আলিয়া মাদরাসা উচ্চতর দারসেনিজামি পাঠক্রমে রূপান্তরিত হয়, যা আজকের ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ভিত্তি স্থাপন করে (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, আরবি শিক্ষা উন্নয়ন প্রতিবেদন, ২০২১)।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর নতুন সম্ভাবনার দরজা খোলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (কুষ্টিয়া), চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জগন্নাথ ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি শিক্ষা ও গবেষণা নতুন দিগন্তে প্রসারিত হয় (Dr. A.K.M. Nurul Islam, Journal of Islamic Studies, 2018)। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি বা ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ চালু রয়েছে।
আরবি ভাষা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ
আজকের বিশ্বে আরবি ভাষা শুধু ধর্মীয় নয়, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রায় ২৫ লাখ প্রবাসী কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত (Dr. A.K.M. Nurul Islam, 2018)। আরবি জানা শ্রমিক ও পেশাজীবীরা তুলনামূলক ভালো আয়ে, মর্যাদায় ও কর্মসংস্থানে সুযোগ পান।
এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থা—জাতিসংঘ, ওআইসি, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, আলজাজিরা, সৌদি টেলিভিশন, এমনকি আরবি ওয়েবমিডিয়াগুলোতেও দক্ষ অনুবাদক, সাংবাদিক ও গবেষকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে (Dr. A.K.M. Nurul Islam, 2018)। বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি হতে পারে এক অনন্য কর্মক্ষেত্র।
আধুনিক চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
তবে আরবি চর্চার পথে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী আরবিকে শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা হিসেবে দেখে, আধুনিক যোগাযোগ ও প্রযুক্তির ভাষা হিসেবে নয় (ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, ১৯৯৭)। ফলে অনুবাদ, মিডিয়া, সফটওয়্যার, কূটনীতি বা ভাষাতত্ত্বে পেশাগত আগ্রহ কম।
এই বাস্তবতায় কিছু কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন—
১. সমন্বিত পাঠক্রম: প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ধারাবাহিক আরবি শিক্ষা নীতি তৈরি করতে হবে, যেখানে ধর্মীয় ও আধুনিক প্রেক্ষাপট উভয়ই থাকবে (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২০২১)।
২. আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র: সরকারি পর্যায়ে ভাষা ল্যাব ও অনলাইন শেখার প্ল্যাটফর্ম স্থাপন।
৩. আরবি-বাংলা অনুবাদ ইনস্টিটিউট: ইসলামী সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহ অনুবাদে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা।
৪. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: মিশর, সৌদি আরব, মরক্কো ও কুয়েতের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একাডেমিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম চালু করা।
৫. ডিজিটাল ও মিডিয়া সংযোগ: ইসলামিক কনটেন্ট, দাওয়াহ, সাংবাদিকতা ও আরবি নিউজপোর্টালে প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশে আরবি ভাষা চর্চার ভবিষ্যৎ আশাব্যঞ্জক। একদিকে কওমি ও আলিয়া ধারার হাজারো মাদরাসা এই ভাষার ভিত্তি মজবুত করছে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা, অনুবাদ ও সাহিত্যচর্চা নতুন দিগন্ত খুলছে (ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, ১৯৯৭; ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২০২১)।
ডিজিটাল যুগে আরবি ভাষার ব্যবহার যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন ট্রান্সলেশন ও ইসলামিক ডেটাবেইসের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তেমনি আরবি জানার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও আরও গভীর হতে পারে (Dr. A.K.M. Nurul Islam, 2018)।
বাংলাদেশে আরবি ভাষার ইতিহাস মূলত এক জ্ঞানের সাধনার ইতিহাস—যেখানে ধর্ম, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির সমন্বয় ঘটেছে। অতীতের সুলতানি ঐতিহ্য, ঔপনিবেশিক প্রতিরোধ, মাদরাসার নিবেদন ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক নবজাগরণ—সব মিলে এই ভাষা আজও জীবন্ত ও সম্ভাবনাময়।
যদি সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ মিলিতভাবে আরবিকে কেবল ধর্মীয় শিক্ষার সীমায় না রেখে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও পেশাগত উন্নয়নের উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ায় আরবি ভাষা গবেষণা ও ইসলামী জ্ঞানের নতুন কেন্দ্র (ড. আব্দুল করিম, ২০০০; Dr. A.K.M. Nurul Islam, 2018; ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২০২১)।