প্রফেসর ড. মো. আতী উল্লাহ
উপরের শিরোনামে আমি ‘রাজনীতি’ নামটি না বসিয়ে, বসিয়েছি ‘রাষ্ট্র-নীতি’। এর কারণ হচ্ছে, ‘রাজনীতি’ শব্দটি একটি ঔপনিবেশিক শব্দ। দেশে-বিদেশে বিশ^বিদ্যালয়-পর্যায়ে ৪৬ বছরের ইংলিশের অধ্যাপক হয়ে আমি তো জেনে- শোনে এ ভুল করতে পারি না।
অন্য দেশ এতে কী করল বা কী ভাবল, তাতে আমার দেশের কিছু যায়-আসে না, বরং প্রয়োজনে তারা আমাদেরকে অনুসরন করতে পারে। আমাদের কোন রাজা নেই, নেই কোন রাজদরবারও। তাই, থাকবে না কোন ‘রাজনীতি’ও।
আর আমরা কারো প্রজাও নই। আমরা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের সুনাগরি। আর, আমার নিজের বেলায়, আমি আমার দেশের একজন ‘সিনিওর’ নাগরিক। অতএব, আমার অভিজ্ঞতায়, আমি তো সংস্কার চাইব-ই।
আমাদের ‘দেশ’ বললেও আছে; ‘রাষ্ট্র’ বললেও আছে। তাই, আমাদের দেশে চলবে ‘দেশনীতি’ বা ‘রাষ্ট্রনীতি’। ‘রাজ’ বলতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট যত শব্দই আসবে, আমাদের দেশে সবই বাদ পড়বে। একে একে আমি সবগুলোর উপরেই লিখেছি এবং লিখবও।
ইতিমধ্যেই আমি ১৫ ভলিউম বই বের করেছি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ ভাবে বেরুতেই থাকবে ইন শা আল্লাহ। এতে কোথাও কারো কোন খট্কা লাগলে আমাকে জিজ্ঞেস করতেই পারেন। ইন শা আল্লাহ, র্ক্বোআন-সুন্নাহ্র ভিত্তিতে ঊত্তর দিয়ে আমি আপনাদের কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকব।
আমাদের ফিল্ড মার্শাল নেতা নবীজি সাঃ ‘মদিনা’ ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পর জীবনের শেষ ১০ বছরই ছিলেন পৃথিবীতে একচ্ছত্র নেতা। তৎকালীন দুই মহা পরাশক্তি রোম ও পারস্যও নবীজির মোকাবেলায় কোন সাহস কখ্খনো দেখাতে পারে নি। সো, নবীজি ছিলেন তৎকালীন বিশে^র এমন এক অদ্বিতীয় ফিল্ড মার্শাল রাষ্ট্রনায়ক “যিনি ছিলেন স্যাকেন্ড টু নান্”।
চির আধুনিক মহা বিজ্ঞান-গ্রন্থ আল-র্ক্বোআন আরম্ভই হয়েছে রাষ্ট্র-নীতি দিয়ে=আমাদের ব্যবরিত শব্দ ‘রাজনীতি’ দিয়ে নয়। লক্ষ্য করুন, সূরাহ্ ‘আল-ফাতেহা’ঃ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيم .ঃধুঅ ঃংৎরঋ
(আমরা অনেকেই মনে করি ’বিস্মিল্লাহ্’ শুধু একটি দোয়া। না, এটি আল-র্ক্বেআনের, প্রথম সূরাহ্, “ফাতেহা’র একটি আয়াতও। এটি মিলেই সূরাহ্ ’ফাতেহা’র আয়াত-সংখ্যা মোট সাতটি, যে সাতটির কথা আল্লাহ্ নিজেও উল্লেখ করেছেন অন্য সূরায়)
খুব ভাল করে লক্ষ্য ও চিন্তা করুন, আল-র্ক্বোআন আরম্ভই হলো ‘আল্লাহ্’র নাম মুখে নিয়ে। আল্লাহ্ মহা প্রক্্রমশালী এবং অদ্বিতীয় না হলে প্রারম্ভটি অন্য কারো নাম বা যে কোন ভিন্ন নাম মুখে নিয়েও আরম্ভ হতে পারত। কিন্তু তা না করে শুধু প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে “বিস্মিল্লাহ্”- অতএব, আপনি বুঝতেই পারছেন, এ আয়াতটির শেষের অংশেই লুকিয়ে আছেন স্বয়ং “আল্লাহ্” নিজে, কারণ, তিনি অদৃশ্য। আর, অদৃশ্যে বিশ^াস স্থাপন করার নামই “ঈমান”।
পরিষ্কারভাবে দেখে নিন্, উপরে আরবি শব্দ-গুলোর ২ নম্বর শব্দই “আল্লাহ্”, যিনি দৃশ্যমান নন্। আর, এ অদৃশ্যে বিশ্বাস করার নামই হচ্ছে “ঈনান বিল্ গায়েব”। আর, এ রকম বিশ^াস স্থাপনের সময় হচ্ছে তোমার এ জীবন; আর, এ রকম বিশ^াস স্থপন করার জায়গা হচ্ছে এ পৃথিবী, যখানে তুমি বসবাস করছ। আখেরাতে গিয়ে ঈমান আনা-এ রকম ঈমান গ্রহনযোগ্য নয়, কারণ, আখেরাত ঈমান আনার জায়গা নয়।
আর, মৃত্যুর লগ্নে বা মৃত্যুর পর আখেরাতের সবকিছু দৃশ্যমান হওয়ার পরে বিশ^াস স্থাপন করার নাম ঈমান নয়, কারণ, এ বিশ^াস ‘অদৃশ্যে বিশ^াস’ বা “ঈমান বিল্ গায়েব” নয়। তাই, ঈমানের শর্ত হচ্ছে মাত্র দু’টিঃ
১. সময়ঃ তোমার এ পার্থিব জীবন। আর,
২. এ ঈমান আনার জায়গা হচ্ছেঃ এ পৃথিবী।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হচ্ছে, ইংরেজি ‘ক্রাউন’ বা বাংলায় ‘রাজমুকুট’ শব্দটি ইংলিশ এ্যটিমোলোজি হতে উৎপন্ন হয়েছে, যেমন উৎপন্ন হয়েছে ইংলিশ ‘ম্যান’ শব্দটিও।
ঠিক একই ভাবে, আরবি ‘আল্লাহ্’ শব্দটি আরবি এ্যটিমোলোজি থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। আর, এ্যটিমোলোজি শব্দের বাংলা হচ্ছে ‘ব্যুৎপত্তিবিজ্ঞান’। আর, ইংরেজরাও বলে, ‘আল্লাহ্’ শব্দটি আরবি ব্যুৎপত্তিবিজ্ঞান থেকেই উৎপন্ন হয়েছে, এবং এটি মোহাম্মেদান বা ইসলামিক একটি শব্দ।
তাই আমাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে স্বীকার করতেই হবে, আল্লাহ্র চাইতে বড় অন্য কেউই নেই, এবং থাকতেও পারে না। আল-র্ক্বোআন বলছেঃ “আল্লাহ্ বড়, আর অন্য যাবতীয় সবকিছুই ছোট”। “আল্লাহু আকবার”-এর সোজা অর্থ “আল্লাহ্ বড়”। “আল্লাহ্ সব চাইতে বড়”-এ অনুবাদ সঠিক নয়, কারণ, আল্লাহ্র সাথে অন্য কোনকিছুরই তুলনা হয় না।
কিন্তু, “চাইতে” শব্দটি ব্যবহার করলে তুলনা হয়ে যায়, মনে হয়, আল্লাহ্র পরে অন্য কেউও তুলনামুলকভাবে ‘বড়’ আছে। এ মহাবিশে^ আল্লাহ্ একক, তাঁর কোন সাহায্যকারি বা অংশিদার লাগে না। তাঁর সৃষ্ট যত জগৎসমূহ আছে, ওসবগুলোর একচ্ছত্র মালিকানা একমাত্র তাঁরই কে¦াদ্রতি হাতে। তিনি ওগুলোর উপর পূর্ণ নিয়ত্রন-ক্ষমতা রাখেন এবং ওগুলোর পরিচালনায় ন্যূনতম কোন ক্লেশও তাঁকে স্পর্শ করে না।
সকল কাজের বেলায়ই তিনি (আল্লাহ্) অমুখাপেক্ষি এবং একমাত্র অধিশ^র। তাঁর জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই। তিনি শাশ^ত, চিরন্তন, পাক এবং পবিত্র। সকল বাদশাহি এবং রাজত্ব একমাত্র তাঁরই হাতে। তাই, এমন-ই একজনের নাম মুখে নিয়ে র্ক্বোআনে পাকের প্রারম্ভ।
আল্লাহ্ কারো খলিফা বা প্রতিনিধি নন্, বরং তিনি সর্বেসর্বা। আর, আমরা মানুষ হচ্ছি পৃথিবীতে তাঁর ‘খলিফা’। এ “মানুষ-খলিফা” আকাশ-পাতাল-মহাবিশ^ চালাবে তাঁরই দেয়া সংবিধান দিয়ে। এ জন্য পাক র্ক্বোআনে ‘সংবিধান’ বা ‘শাসনতন্ত্র’ শিরোনামে একটি সূরাহ্ই বরাদ্দ আছে।
র্ক্বোআনে আরও বরাদ্দ আছে অপর একটি সূরাহ্, এর শিরোনাম হচ্ছে ‘সাম্রাজ্য’। অর্থাৎ এ গোটা মহাবিশ্ব আল্লাহ্র একক একটি সা¤্রাজ্য এবং এটি চলবে তাঁরই দেয়া শাসনতন্ত্র অনুযায়ী। আকাশ-মন্ডলি যাঁর, আইন চলবে তাঁর। পাতাল-মন্ডলি যাঁর, আইন চলবে তাঁর। সকল সৃষ্টি যাঁর, সকল সৃষ্টির উপরে আইনও চলবে তাঁর, যেহেতু আল্লাহ্ই একক বাদশাহ্, একক রাজা, একক স¤্রাট, একক আইন-দাতা, একক বিচারপতি, একক রায়-দাতা, একক পরিচালক, একক নিয়ন্ত্রনকারি, একক হুকুম-কারি, একক পুরষ্কার-দাতা, একক শাস্থি-দাতা, একক ধনী, একক ক্ষমতাবান, ইত্যাদি।
গোটা র্ক্বোআন রাজনীতিতে ভরপুর, ভরপুর যুদ্ধনীতিতেও, শিক্ষানীতিতেও, মানব-নীতিতেও, রাষ্ট্রনীতিতেও, দেশনীতিতেও, পররাষ্ট্রনীতিতেও, পরিবার-নীতিতেও, সমাজ-নীতিতেও, বিশ^নীতিতেও, ইত্যাদি।
কিন্তু, আমরা নাই আল্লাহ্র দেয়া সঠিক জাগতিক-নীতিতেও, নাই আধ্যাত্বিক নীতিতেও, নাই নৈতিকতায়ও, ইত্যাদি।
আমরা হতভাগারা র্ক্বোআন পড়বও না, এর পঠন-পাঠনেও নাই, অনুসন্ধানেও নাই, বুঝাবুঝিতেও নাই, র্ক্বোআন-গবেষণায়ও নাই, এর বিশ্লেষনেও নাই, প্রচারেও নাই। আমরা আছি শুধু নিজেদের ধান্দায়, তাই আমরা শুধু অশান্তি-গজবের মধ্যে পড়ে আছি।
লেখক: প্রফেসর ড. মো.আতী উল্লাহ, ইংরেজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও ২৪ বছরের বিভাগীয় প্রধান, বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠতম অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট, ও দেশে-বিদেশে ৪৬ বছরের ইংরেজি ভাষা ও ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক।