মৃত্যুঞ্জয় রায়
লাল পেটের লম্বামুখী মাকড়সা। সুন্দরবন থেকে তোলা। ছবি : লেখক
সুন্দরবন এক রহস্যময় বন। এ বছর এপ্রিলে সুন্দরবনে গিয়েছিলাম কিছু গাছপালার সন্ধানে। দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জে কালীর খালের পাশে এক ঝোপ হুদোঘাসের পাশে দাঁড়িয়ে হঠাৎ চোখ পড়ল একটা পাতার উল্টো পিঠে। হুদোঘাস নাম হলেও আসলে তা এক জাতীয় ফার্ন।
পাতার লম্বা ফিতাসদৃশ, এগুলোকে বলে ফ্রন্ড। এর নিচের পিঠের রং মরিচা, ওপরের পিঠ সবুজ। পাতার নিচে প্রচুর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্পোর জন্মে বলে এ রকম রং সৃষ্টি হয়। পাতার ওপরের পিঠ মসৃণ, নিচের পিঠ খসখসে।
সে পিঠেই দেখলাম একটা মাকড়সা আটটা ঠ্যাং টান টান করে ঘুমাচ্ছে। আহা কী শান্তি ওর! আর কী চালাকিই না জানে সে। পাতার ওপরেও বিশ্রাম নিতে পারত। তাতে ওর লালচে-মরিচা দেহটা পরিষ্কার দেখা যেত।
আর তাতেই ওর শান্তির ঘুমটা আর হতো না। কেউ না কেউ তাকে বিরক্ত করত, আর কেউ না হলেও পুরুষটা ওর সঙ্গে হয়তো খাতির জমাতে আসত, পাখিরা ঠোঁটে করে ছোঁ মেরে তুলে আকাশে উড়ে যেত। তাই পাতার নিচে ওর লুকিয়ে থাকা। পাতার সঙ্গে দেহের রং মিলিয়ে ছদ্মবেশ ধরা।
এরা সাধারণত রাতের বেলায় সক্রিয় ও সজাগ থাকে, দিনের বেলায় বিশ্রাম নেয়।
বিশ্রাম নেওয়ার সময় ওরা এমনভাবে ছদ্মবেশ ধরে যেন ওরা জীবন্ত কোনো প্রাণী বা মাকড়সা না, মরা ডাল বা পাতার একটি অংশ। ওরা যে জাল বুনে শিকারের অপেক্ষায় বসে থাকে, সেই জালেই হাঁটি হাঁটি পা পা করে পুুরুষ মাকড়সাটি মেয়ে মাকড়সার সঙ্গে সখ্য করতে আসে। সেখানেই ওরা পাগুলো দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে জড়াজড়ি করে মিলনে যায়। সাধারণত বসন্তের শেষে বা গ্রীষ্মকালে এরা মিলন করে। মেয়ে মাকড়সা রেশমি খোলসের মধ্যে ডিম পাড়ে এবং সেগুলো গাছের সঙ্গে সুতো দিয়ে আটকে রাখে। একটি ডিমের খোলসের মধ্যে ৬০ থেকে ১০০টি ডিম থাকতে পারে। কয়েক সপ্তাহ পর ডিম ফুটে ছানারা বের হয়। ছানারা পাঁচ থেকে ছয়বার খোলস বদলানোর পর পরের বসন্তে ডাঙর হয়। একবার জীবনচক্র সম্পন্ন করতে ওদের প্রায় এক বছর লেগে যায়। এরা পায়ে হেঁটে, সাঁতরে বা সুতায় ঝুলে বাতাসে ভাসতে ভাসতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়। অধিকাংশ মেয়ে মাকড়সা ডিম পাড়ার পর মারা যায়।
এরা নামে মাকড়সা হলেও আসলে ওদের মাকড়সা বলে মানতে মন চায় না। মাকড়সাদের যে রকম পেট থাকে, মুণ্ডু থাকে, আটটা পা চারদিকে ছড়িয়ে জালের ওপর বসে থাকে। এরা সে রকম না। পা ও দেহকে একটা সরল রেখায় রেখে ওরা বিশ্রাম নেয়। এটাই ওদের ছদ্মবেশ ধরার মূল কৌশল। অন্য মাকড়সাদের চেয়ে এদের মুখের চোয়াল লম্বা বলেই এদের বলে লম্বামুখী মাকড়সা। এই প্রজাতির লম্বামুখী মাকড়সার পেটটা লাল, সে জন্য এর ইংরেজি নাম Red belied long jawed spider, প্রজাতি Tetragnatha rubriventris, গোত্র টেট্রাগন্যাথিডি। প্রজাতিগত নামের শেষাংশ rubriventris অর্থ red-bellied.
এই প্রজাতির মাকড়সার মাথা ও বুক হলদে বা লালচে বাদামি, পেট বা উদরের ওপর মাঝে মাঝে দাগ দেখা যায়। উদর সরু ও লম্বা এবং হালকা থেকে গাঢ় বাদামি। পা আটটি, অত্যন্ত লম্বা ও সরু, দেহের চেয়ে পা লম্বা। লম্বা পা দিয়ে হাঁটতে এমনকি পানির ওপর দিয়ে দৌড়ে যেতে পারে। চোয়ালও লম্বা, চোয়াল মাথার চেয়েও বড় ও লম্বা। চোখগুলো ক্ষুদ্র, মাথার সামনের দিকে দুই সারিতে চোখগুলো সাজানো থাকে। সামনের সারির চোখগুলো পেছনের সারির চোখের চেয়ে কিছুটা বড়। এরা ঘাসে বা ধানক্ষেতেও থাকে। ধানক্ষেতে এরা ক্ষুদ্র পোকাদের শিকার করে খায়। এরা পাতের মতো জাল বোনে। সেই জালে শিকার পোকাকে আটকে খায়।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের অনুসন্ধান করতে গিয়ে সেখানকার উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীবসহ দুই হাজার ৪৯৩ প্রজাতির জীবের নাম পেয়েছি। এগুলোর মধ্যে মাকড়সাও আছে। মাকড়সারা এই পৃথিবীর বুকে প্রায় ৩০ কোটি বছর ধরে স্বাধীনভাবে বসবাস করে আসছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে ১৩৪টি পরিবারের ৫২ হাজার ৩০৯ প্রজাতির মাকড়সা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে ২১ পরিবারের ১০০টি গনের মোট ৩৩৪ প্রজাতির মাকড়সা শনাক্ত করা হয়েছে। ভারতীয় সুন্দরবনে পাওয়া গেছে ১১৫ প্রজাতির মাকড়সা। গবেষকরা এসব প্রজাতির মধ্যে দুটি প্রজাতির লম্বামুখী মাকড়সা রয়েছে। সারা পৃথিবীতে রয়েছে ৩০৯ প্রজাতির লম্বামুখী মাকড়সা। লম্বামুখী মাকড়সার এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতিকে সঠিকভাবে চেনা খুব সহজ নয়। গবেষণা চালালে এ দেশে এবং সুন্দরবনে আরো অনেক প্রজাতির মাকড়সা পাওয়া যাবে।
লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ