1. news@sangbadeisomoy.com : সংবাদ এই সময় : সংবাদ এই সময়
  2. info@www.sangbadeisomoy.com : সংবাদ এইসময় :
বাংলাদেশের মিডিয়ার বর্তমান অবস্থা: কেন আদর্শ কোড জরুরি? - সংবাদ এইসময়
শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:১১ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের মিডিয়ার বর্তমান অবস্থা: কেন আদর্শ কোড জরুরি?

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৬ বার পড়া হয়েছে

নুসরাত জাহান

গণমাধ্যম এক সময় ছিল সমাজের আয়না, যেখানে সত্যের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠত, আর জনগণ সেই আয়নায় নিজেদের বাস্তবতা দেখত। কিন্তু এখন সেই আয়না যেন ভেঙে বহু খণ্ডে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কোন খণ্ডে সত্য, কোন খণ্ডে স্বার্থ তা আলাদা করা কঠিন। আজকের গণমাধ্যম যেন সেই ভাঙা আয়না, যেখানে যতই তাকানো হোক, স্পষ্টতা মেলে না বরং বিভ্রান্তিই বাড়ে। গণমাধ্যম বলতে আমরা বুঝি সরকার ও জনগণের মধ্যকার সেতু। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে শুধু বিদ্যমান রয়েছে কুয়াশা। যা চলে প্রভাবশালীদের ইশারায়।

ভ্রমণ প্যাকেজ
বাংলাদেশের গণমাধ্যম একসময় ছিল জনমানুষের কণ্ঠস্বর, রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার হাতিয়ার। পত্রিকার পাতায় সত্য প্রকাশ পেত, টিভির পর্দায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী রিপোর্ট হতো, আর সাংবাদিকতা মানেই ছিল সাহস, সততা, নীতি। কিন্তু গত এক দশকে গণমাধ্যমের চরিত্র ভয়াবহভাবে বদলে গেছে। এখন একটি ফেসবুক পেজ খুলে, হাতে ক্যামেরা নিয়ে যে কেউ নিজেকে সাংবাদিক বলে দাবি করছে। পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই, নৈতিক বোধ নেই এবং দায়িত্বের তো প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া মূলধারার গণমাধ্যমও নানা পক্ষের প্রভাব, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে বন্দি হয়ে পড়েছে। জনগণের কথা বলা দিন দিন কমে যাচ্ছে বরং ক্ষমতাবানদের কথা বলা ও তাদের সুযোগ-সুবিধা রক্ষা করাই যেন বড় কাজ। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনও এ সমস্যাকে বড় সংকট হিসেবে দেখেছে এবং গণমাধ্যমের জবাবদিহি, স্বাধীনতা ও নৈতিক মানদণ্ড পুনর্গঠনের ব্যাপারে নানা সুপারিশ করেছে।

বাংলাদেশের বর্তমান মিডিয়ার সবচেয়ে প্রকট সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম ফেসবুক সাংবাদিকতার উত্থান। হাতে স্মার্টফোন থাকলেই যেন সাংবাদিকতা করা যায় এমন মানসিকতা ভয়াবহ ক্ষতি করছে। ভুয়া নিউজ, ভুয়া পরিচয় এবং ভুয়া অনুসন্ধানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত হচ্ছে। প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য মিডিয়াকে কলুষিত করছে। রাজনীতি, ব্যবসা, কর্পোরেট শক্তি সব জায়গায় গণমাধ্যমের ওপর চাপ রয়েছে। অনেক রিপোর্ট প্রকাশ হতে পারে না। কারণ তা ওপর থেকে থামানো হয়। ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে। জবাবদিহির অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ।

রাজনৈতিক কভারেজ
ভুল বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো জবাবদিহি বা পর্যালোচনা হয় না। বরং ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ে, মানুষের জীবন, সম্মান বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মৃত্যু দেখা দেয়। সত্য উন্মোচনের সাহসী সাংবাদিকতা এখন প্রায় বিলুপ্ত। কারণ তদন্তমূলক রিপোর্ট করতে গেলে ঝুঁকি, চাপ, হুমকি সবই রয়েছে। এ ছাড়া অনেক গণমাধ্যমেই তা করতে পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই। বাণিজ্যিকীকরণের দৌরাত্ম্যের কারণে সংবাদ এখন বিজ্ঞাপন-নির্ভর। সংবাদ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং জনপ্রিয়তার মেট্রিক্স প্রাধান্য পাচ্ছে, জনগণের বাস্তব সমস্যা নয়।

গণমাধ্যমের এ দুরবস্থার পেছনে রয়েছে কিছু কারণ। যার মধ্যে প্রথমেই আসে নীতি ও আদর্শের অভাব। সাংবাদিকতার মূল মন্ত্র সত্য, নিরপেক্ষতা, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এখন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। কোনো নৈতিক মানদণ্ড বা আচরণবিধি নেই- যা সব প্রতিষ্ঠান মেনে চলবে। আইনি কাঠামোর দুর্বলতার কারণে এমনটি হয়ে থাকে।

যে আইনগুলো আছে তা অনেক সময় সাংবাদিককে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহৃত হয়, সুরক্ষা দিতে নয়। আর ভুয়া সাংবাদিকরা আইনি ঝামেলাও এড়িয়ে যায়। মালিকানার কেন্দ্রীকরণ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এক-দুটি পরিবারের হাতে অনেক গণমাধ্যম এ ধরনের মালিকানা গণমাধ্যমকে পক্ষপাতদুষ্ট করে তোলে। মালিকের স্বার্থই সেখানে বড়, জনগণ নয়। প্রশিক্ষণহীন কর্মীবাহিনীর ফলে গণমাধ্যমের স্বকীয়তা নষ্ট হয়। সাংবাদিকতা একটি পেশা, কিন্তু এখন এটাকে সবাই শখ হিসেবে দেখা শুরু করেছে। সাংবাদিকতার শিক্ষা, দক্ষতা, নৈতিক প্র্যাকটিস- এসবের অভাবেই পেশার মান কমে গেছে। জবাবদিহির সংস্কৃতি নেই বলে কোনো ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া, সংশোধন করা, কিংবা পুনর্মূল্যায়ন এসবের চর্চা নেই। ফলে গণমাধ্যম ধীরে ধীরে দায়িত্বহীন হয়ে পড়ছে।

অনলাইন সংবাদপত্র
গণমাধ্যমের সঠিক সংস্কারের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। একটি আদর্শ কোড অব কন্ডাক্ট তৈরি। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশে সব সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের জন্য একটি সর্বজনীন নৈতিক আচরণবিধি তৈরি করা দরকার। এতে থাকতে পারে সত্য যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা, সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের নীতি, ভুল তথ্য সংশোধনের নিয়ম, স্বচ্ছতার মানদণ্ড, স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর নিয়ম, সাংবাদিকের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রটোকল সাংবাদিক পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা। কে সাংবাদিক, কে নয় এটা নির্ধারণের জন্য একটি জাতীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা দরকার, যাতে ভুয়া সাংবাদিকতার দৌরাত্ম্য কমে। গণমাধ্যমের মালিকানা ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কোন গণমাধ্যম কার হাতে, তাদের আয়-ব্যয় কোথা থেকে, কোন বিজ্ঞাপনদাতা কীভাবে প্রভাব ফেলে সবই স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুনরুজ্জীবিত করা, প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং অনুসন্ধানী কাজকে উৎসাহিত করতে হবে। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনতে হবে। সংবাদ হবে জনস্বার্থে, জনকল্যাণে। ভিউ, রিচ বা বাণিজ্যিকতা নয়, মানুষের বাস্তব সমস্যাই সংবাদ নির্বাচনের ভিত্তি হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম আজ একটি সংকটের মুখে। এ সংকট শুধু প্রযুক্তিগত নয়, এটি সাংবাদিকতার আত্মার সংকট। গণমাধ্যম যদি সত্যকে হারায়, তাহলে মানুষ হারায় আস্থার জায়গা। আর আস্থা ছাড়া একটি সমাজ অন্ধ হয়ে যায়। তাই আদর্শ কোড অব কন্ডাক্ট এখন শুধু প্রয়োজনই নয়, এটি একটি আবশ্যকতা। এই কোড সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকে নীতি, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্বের একটি কাঠামো দেবে। জনগণের প্রতি সত্যিকার দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনবে। গণমাধ্যম যদি নিজেকে শুদ্ধ করে, তাহলে রাষ্ট্রও শুদ্ধ হবে এবং সমাজ সত্যিকার অর্থে আলোকিত হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
njahan0917@gmail.com

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট