আব্দুল্লাহ আল সিফাত
ছবি: সংগৃহীত
এ পৃথিবীতে এমন একটি গ্রাম আছে, যে গ্রামে পুরুষের প্রবেশ অধিকার নেই। এমন কথা রূপকথার গল্পের মতো লাগলেও এটি কোনো রূপকথার গল্প নয়। সত্যিই রয়েছে এমন একটি গ্রাম। যার রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি। গ্রামের নাম উমোজা, যা ঘন জঙ্গলে আচ্ছাদিত এক ছোট্ট গ্রাম। কেনিয়ার শ্যামবুরু এলাকায় এ গ্রামের অবস্থান।
ঢাকায়
এক-দুই বছর নয়, ৩৫ বছর ধরে ধীরে ধীরে বিকশিত এ গ্রাম, যেখানে স্থায়ী নয় কোনো পুরুষ, এমনকি প্রবেশের অধিকারেও রয়েছে বাধা। তবে এ গ্রাম প্রতিষ্ঠার আড়ালে আছে এক করুণ অধ্যায়। কালো মানুষের দেশ আফ্রিকা বারবার শ্বেতাঙ্গ, সভ্য মানুষদের নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছে। যার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত দাসপ্রথা। এ গ্রামটিও প্রকৃতপক্ষে তেমনই এক অত্যাচারের ফসল। ১৯৯০ সালে গ্রামটি গড়ে তোলেন ১৫ জন নারী। যারা ব্রিটিশ সেনাদের হাতে ধর্ষিতা, নির্যাতিতা হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছিলেন। সেই তীব্র ঘৃণায় কোনো পুরুষের সঙ্গেই আর থাকতে চাননি তারা। ফলে সেই ১৫ জন নারী এই গ্রাম গড়ে তোলেন এবং সেখানে পুরুষের প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেন।
পর্যায়ক্রমে এ গ্রামে নির্যাতিত নারীদের আশ্রয় দিতেও শুরু করেন তারা, পরবর্তীতে আশপাশের এলাকা থেকেও নিপীড়িত নারীরা এ গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে এ গ্রামের প্রতিটি নারীই স্বনির্ভর। তারা মেধাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত আছে এ গ্রামের প্রায় সব সদস্য। প্রত্যয়ী আর স্বনির্ভর এ নারীদের একবার দেখার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসেন। আর এ পর্যটকদের থেকে প্রবেশমূল্য বাবদ পাওয়া সামান্য অর্থকেও গ্রাম উন্নয়নের কাজেই ঢেলে দেন এই নারীরা। গ্রামে রয়েছে নিজস্ব নিয়ম-কানুন ও সংস্কৃতি। কিছু সংখ্যক নারী সম্পূর্ণ গ্রাম পরিচালনা করেন এবং তাদেরও দুই বছর অন্তর অন্তর বদলে দেওয়া হয় বলে জানা যায়।
খেলাধুলার সরঞ্জাম
পুরুষ প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ার পরও গর্ভধারণ করছেন গ্রামের নারীরা, যা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ছুড়ে দেয় আমাদের কৌতূহলি মনকে। না, কোনো অলৌকিক উপায়ে নয়। আসলে গ্রামের আশপাশের অঞ্চলের পুরুষদের মধ্যে থেকেই নিজেদের পছন্দমতো সঙ্গী নির্বাচন করেন তারা। নারীরা একটা সময় গ্রাম থেকে বের হয়ে আশপাশের অঞ্চল থেকে নিজের পছন্দমতো পুরুষ নির্বাচন করে থাকেন। কিন্তু গর্ভধারণের পর আর সেই পুরুষের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখেন না এ গ্রামের নারীরা। এ গ্রামে সন্তানের অধিকার একান্তভাবেই মায়ের। একাই সন্তানকে বড় করার ভার নেন তারা। তবে ছেলেদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলে তাদেরও সেখান থেকে চলে যেতে হয়। তার পর সেই পুরুষ আর ফিরে আসতে পারে না এ গ্রামে। জন্মস্থান হওয়ার পরও একটা সময় অর্থাৎ আঠারো বছর হয়ে গেলে এ গ্রামে জন্মানো ছেলেদের খুঁজে নিতে হয় অন্যত্র বসবাসের জায়গা।
উমোজা গ্রামটি বিখ্যাত মাসাই মারা অভয়ারণ্যের কাছে অবস্থিত। ফলে এখানে অনেক পর্যটক ঘুরতে আসেন। প্রথম দিকে প্রবেশ অধিকার না থাকলেও গ্রামের উন্নয়নের প্রয়োজনে তারা (গ্রামবাসী) খুবই অল্প ফি দিয়ে উমোজায় পর্যটকদের প্রবেশ করতে দিচ্ছেন।
গ্রামের নিজস্ব সংস্কৃতি আর ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয় এক কালো আবছা করুণ অতীত ইতিহাস, যার প্রতিবাদস্বরূপ গ্রামটি এখনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষশূন্য ধারাবাহিকতায় চলছে।