সংবাদ এই সময়।
আঘলাবিদের উৎপত্তি আরবের তামিম গোত্র, বিশেষ করে বনু আনবার ইবনে আমর শাখা থেকে। তাদের বংশধারা প্রাক-ইসলামিক যুগে আরব উপদ্বীপে বসবাসকারী তামিম গোত্রের সঙ্গেই যুক্ত। আঘলাবিরা উত্তর আফ্রিকার পূর্ব আলজেরিয়া, পশ্চিম লিবিয়া ও তিউনিশিয়াসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করত। তারা সিসিলি ও মাল্টাও দখলে রেখেছিল এবং দক্ষিণ ইতালিতে তাদের প্রভাব বিস্তার করেছিল।
এমনকি সার্ডিনিয়া ও কর্সিকাতেও তারা শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাদের শাসনকাল ৮০০ থেকে ৯০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।
প্রতিষ্ঠা ও সামরিক কার্যক্রম : আঘলাব ইবনে সালিম ইবনে আকাল তামিমিকেই সাধারণভাবে আঘলাবীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি আব্বাসীয় বাহিনীর এক বিশিষ্ট সেনাপতি ছিলেন।
পরে ৮০০ থেকে ৮১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তার পুত্র ইব্রাহিম এই পদে অধিষ্ঠিত হন। ৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে হারুনুর রশিদ ইব্রাহিমকে ইফ্রিকিয়ার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন। তবে ৮০০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়লে তিনি গভর্নরের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁর শাসনামলে হারুনুর রশিদ তাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করলেও পূর্ণ স্বাধীনতা লাভে উৎসাহ দেননি।
এই সময় বহু বিদ্রোহের উদ্ভব হয়, যার বেশির ভাগ বারবার গোত্রের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল উত্তর মাগরেব অঞ্চলে হামদিস কিন্দির বিদ্রোহ এবং ১৯৬ হিজরি সালে ত্রিপোলির জনগণের গণবিদ্রোহ। ৮১২ থেকে ৮১৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আবু আব্বাস আবদুল্লাহ ইবনে ইব্রাহিমের শাসনামলে আঘলাবিরা পুনরায় স্বশাসনের স্বাদ পায় এবং স্বাধীনতার অবস্থান পুনরুদ্ধার করে।
ইব্রাহিম ইবনে আঘলাবের শাসনকাল : ইব্রাহিম ইবনে আঘলাব ১৯৬ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি পেছনে রেখে যান একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত আমিরাত, যা তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ আবু আব্বাসের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়।
তবে আবদুল্লাহর শাসনামলে করনীতি ও প্রশাসনিক জটিলতাসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে নানা ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তিনি ২০১ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন জিয়াদাতুল্লাহ ইবনে ইব্রাহিম, যিনি ৮১৭ থেকে ৮৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। মনসুর তানবাদির নেতৃত্বে ঘটে যাওয়া বিদ্রোহ দমনে ব্যাপক ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও জিয়াদাতুল্লাহর আমল ছিল আঘলাবীয় ইতিহাসের অন্যতম সমৃদ্ধ সময়। মনসুর কাইওয়ান পর্যন্ত অবরোধ করলেও শেষ পর্যন্ত জিয়াদাতুল্লাহ তাকে পরাস্ত করতে সক্ষম হন। ৮২৭ খ্রিস্টাব্দের পর আঘলাবিরা সিসিলিতে অভিযান শুরু করে এবং দ্বীপটির বিভিন্ন অঞ্চল দখলে নেয়। পরে ৮৪১ খ্রিস্টাব্দে ইতালির বারি শহর এবং ৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে রোম লুণ্ঠন ও দখল করা হয়, যা আঘলাবিদের সামরিক শক্তি ও বিস্তৃত প্রভাবের সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
২১২ হিজরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য : কাইরুয়ানের প্রধান বিচারপতি আসাদ ইবনে ফুরাত জিয়াদাতুল্লাহ ইবনে আঘলাবের নির্দেশে সিসিলি দখলের লক্ষ্যে এক বিশাল ও সংগঠিত সেনাবাহিনী গঠন করেন। অভিযানের মধ্যেই আসাদ ইবনে ফুরাত মৃত্যুবরণ করেন আর সিসিলির জনগণকে রোমানদের সহযোগিতা—এই দুই কারণে মুসলিম বাহিনী দ্বীপটির বৃহৎ অংশ নিয়ন্ত্রণে নিলেও সম্পূর্ণ দখল করতে সক্ষম হয়নি। পরে মুসলিমরা কাইরুয়ান থেকে নতুন সহায়তা পায় এবং মুহাম্মদ ইবনে আবি জাওয়ারির নেতৃত্বে সিসিলিতে সফলভাবে অগ্রসর হয়। ২২১ হিজরিতে জিয়াদাতুল্লাহ ইন্তেকাল করলে তাঁর ভাই আবু আকাল আমির হন। তিনি শাসনভার গ্রহণ করে বহু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেন—অন্যায় দমন, মদের লেনদেন নিষিদ্ধকরণ এবং সামাজিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর প্রধান উদ্যোগ। তাঁর শাসনামলে সিসিলির দুর্গসমূহ দখল এবং দ্বীপ পুনরুদ্ধারে আগ্রসর রোমান বাহিনীকে পরাজিত করার মতো বহু সামরিক সাফল্য অর্জিত হয়। ২২৬ হিজরিতে তাঁর মৃত্যু হলে তাঁর পুত্র প্রথম আবুল আব্বাস শাসনভার গ্রহণ করেন এবং ক্ষমতা ও প্রশাসনের দায়িত্ব তাঁর হাতে অর্পিত হয়।