হাবিবুর রহমান সুজন
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্বর্গরাজ্য সাজেক। পাহাড়, মেঘ আর প্রকৃতির অপার রূপ দেখতে প্রতিদিনই দেশ–বিদেশ থেকে পর্যটকদের ঢল নামে এখানে। এই সাজেকেই একসময় পর্যটকদের প্রিয় আড্ডাস্থল ছিল চিলেকোঠা রেস্টুরেন্ট। কিন্তু কয়েক মাস আগে হঠাৎ লাগা আগুনে রেস্টুরেন্টটি পুরোপুরি পুড়ে যায়। স্বপ্ন, বিনিয়োগ, সংগ্রহ—সবকিছু এক নিমিষে হারিয়ে একটি কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়াতে হয় মালিক-ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে।
তবে হাল ছাড়েননি তারা। দীর্ঘদিনের কষ্ট, শ্রম আর স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় পুড়ে যাওয়া চিলেকোঠা আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে। আগের চেয়ে আরও সুন্দর সাজে, আরও পরিপাট্য পরিবেশে, আরও আন্তরিকভাবে।
দরিদ্র পর্যটকের পাশে মানবিক ম্যানেজার
চিলেকোঠা রেস্টুরেন্টের নতুন অধ্যায়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি হলো তাদের মানবিক আচরণ। প্রতিদিন সাজেক আসা অনেক পর্যটক থাকে যারা বাজেট সংকটে পড়ে খাবার খেতে পারেন না। বিশেষ করে অনেকে দূরদূরান্ত থেকে আসে, কিন্তু সবকিছু হিসাব করে চলা কঠিন হয়ে পড়ে।
তখনই ম্যানেজারের সেই মানবিক বাক্য—
“টাকা নাই? সমস্যা নাই। আগে খেয়ে নিন। রিজিকের মালিক আল্লাহ।”
এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পর্যটকদের অনেকেই জানিয়েছেন, সাজেকের মতো দূর পাহাড়ি অঞ্চলে এমন আচরণ সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যায়। খাবারের বিল দিতে পারবেন কি না—তা না ভেবে মানুষকে প্রথমে সম্মান ও প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে রেস্টুরেন্টটি।
আগুনের ভয়াবহতা থেকে নতুন সূচনার গল্প
রেস্টুরেন্টের কর্মীরা জানান, আগুন লাগার দিনটি ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়। কিন্তু সেই ভয়কে জয় করে তারা আবার দাঁড়িয়েছেন। স্থানীয়রা সহযোগিতা করেছে, পর্যটকরাও মনোবল যুগিয়েছে।
রেস্টুরেন্টটির নতুন রূপে ফিরে আসা শুধু একটি ব্যবসার পুনরুদ্ধার নয়—এটি সাজেকের আতিথেয়তার প্রতীক।
পর্যটকদের দৃষ্টিতে চিলেকোঠা
নতুন করে যাত্রা শুরু করার পর রেস্টুরেন্টটিতে ভিড় আগের থেকেও বেশি।
কেউ বলেন—এখানকার খাবারের স্বাদ আলাদা,
কেউ বলেন—মানবিকতার কারণে তারা এখানে আসতেই বেশি পছন্দ করেন।
একজন পর্যটক জানান,
“সাজেকের মেঘ দেখেছি, পাহাড় দেখেছি, কিন্তু চিলেকোঠার মানুষের মনটা সবচেয়ে সুন্দর।”
মেঘের রাজ্যে দয়ার আলো
সাজেককে বলা হয় মেঘের রাজ্য। এখানকার প্রকৃতি যেমন মন ভরিয়ে দেয়, চিলেকোঠার এই মানবিকতা তেমনি মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তোলে। রেস্টুরেন্টটির একটি প্রচলিত বাক্যই এখন সাজেকজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে—
“মানুষকে হতাশ করলে রিজিক কমে যায়। তাই আমরা কাউকে ফিরিয়ে দিই না।”
শেষ কথা
আগুনের ছাই থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ানো, পর্যটকদের প্রতি সেবার মনোভাব, আর মানুষের প্রতি আন্তরিকতার এই গল্প শুধু চিলেকোঠা রেস্টুরেন্ট নয়—সাজেকের পরিচিতিকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।
মেঘপাহাড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিলেকোঠা যেন মনে করিয়ে দেয়—
দুনিয়ার ব্যবসা–লাভ ক্ষতির হিসাবের বাইরে মানুষই সবচেয়ে বড় শক্তি। রিজিকের মালিক আল্লাহ—আর সাহায্যের জন্য হাত বাড়ানোর মধ্যেই আছে প্রকৃত মানবতা।