এম আবদুল্লাহ
জুলাই বিপ্লবী শরীফ ওসমান হাদির ঝাঁকড়া চুলের মাথা ঘাতকের গুলিতে ঝাঁজরা হয়েছে। অজ্ঞান ও সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছেন হাসপাতালে। চিকিৎসকরা আশার কথা শোনাতে পারছেন না। এ লেখার সময় পর্যন্ত ডাক্তারের ভাষায় তিনি বেঁচে আছেন, তবে ডিপ কোমায়। শুক্রবার জুমার নামাজের পর দিনদুপুরে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র পুরানা পল্টন কালভার্ট রোডে পয়েন্ট ব্ল্যাংক গুলি হাদির মাথার একদিক থেকে ঢুকে মগজ ভেদ করে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। চলন্ত রিকশায় বসা হাদিকে মোটরসাইকেল আরোহী নরপিশাচ ঘাতকরা পেছন থেকে অনুসরণ করে খুব কাছে রিভলভারের গুলিতে হত্যা নিশ্চিত করতে চায়। পালিয়ে যায় নির্বিঘ্নে। খবরটি জেনে স্তম্ভিত ও কিছু সময়ের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা অতিক্রান্ত না হতেই প্রচার চালানোর সময় একজন প্রার্থীকে হত্যাচেষ্টা চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে।
ওসমান হাদি জুলাই বিপ্লবের আইকনিক ফিগার। ভারতীয় আগ্রাসন ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদ থেকে জাতীয় মুক্তির লড়াইয়ে অন্যতম নায়ক। তেত্রিশ বছর বয়সি হাদি এক দুরন্ত সাহসী ও অকুতোভয় দ্রোহের নাম। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের কালচারাল এস্টাব্লিশমেন্ট গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে হাদির সংগ্রামকে ভিলিফাই করে তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ চাওয়া হাদিকেই আগ্রাসী ভারত ও তাদের সেবাদাস পতিত লীগ ভয় পেয়েছে। তার ইনসাফের কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ওসমান হাদি ইনসাফভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য নিরলসভাবে লড়ে যাচ্ছিলেন। ভারতীয় আধিপত্যবাদ আর শাহবাগিদের বিরুদ্ধে ওসমান হাদি এক উচ্চকিত কণ্ঠ।
চব্বিশের জুলাইয়ের পটভূমিতে জন্ম নেওয়া ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণায় তৎপর হয়েছিলেন তিনি। প্রতি শুক্রবারে জনসংযোগ করতেন। সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে শুধু নয় সর্বস্তরের দেশপ্রেমিক বিবেকবান মানুষকে ক্ষুব্ধ ও আলোড়িত করেছে। সুবিধাবাদিতা, চাটুকারিতা আর নতজানু মানসিকতার মানুষের ভিড়ে হাদিদের মতো নির্ভীক ও নির্ভেজাল দেশপ্রেমিকের সংখ্যা হাতে গোনা। সে কারণেই মহান আল্লাহর দরবারে হাদির জীবন ভিক্ষা চাচ্ছে অগণন মানুষ।
বিএমইটি সিন্ডিকেটে অসহায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়
হাদির জীবন যে অনিরাপদ ছিল, তা একাধিকবার জানান দিয়েছেন তিনি নিজেই। গত নভেম্বরে হাদি নিজের ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়ে বলেন, দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি ফোন নম্বর থেকে তাকে ফোন এবং মেসেজ পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে, তার বাড়িতে আগুন দেওয়া ও তার মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে। ওই পোস্টে তিনি লেখেন, আওয়ামী লীগের ‘খুনি’ সমর্থকরা তাকে সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখছে। ‘জীবননাশের আশঙ্কা’ সত্ত্বেও তিনি ‘ইনসাফের লড়াই’ থেকে পিছিয়ে যাবেন না। ভারতীয় আগ্রাসন ও সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে নিরাপস ভূমিকা এবং কড়া অথচ যুক্তিনির্ভর বক্তব্যের জন্য তিনি সোশ্যাল মিডিয়াতেও বেশ আলোচিত ছিলেন।
আমার দেশ-এ প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় আগ্রাসন এবং আওয়ামী লীগের দেশবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অন্যতম সোচ্চার কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত শরীফ ওসমান হাদিসহ শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন জুলাইযোদ্ধার ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা হতে পারে—এমন স্পর্শকাতর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরকারকে আগেই জানানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। টার্গেট কিলিংয়ের ওই তালিকায় হাদি ছাড়াও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদসহ আরো কয়েকজন জুলাই সংগঠক রয়েছেন বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। গত সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী জনৈক আইনজীবীর সূত্রে প্রাপ্ত এ-সংক্রান্ত তথ্য যথাসময়ে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাসহ উচ্চপর্যায়ের কাছেও পৌঁছে দেওয়া হয়। এমনকি খোদ ওসমান হাদিসহ তিন জুলাইযোদ্ধা নিজেরাই হুমকির বিষয়টি সরকারের দায়িত্বশীলদের নজরে আনেন। এছাড়া পৃথকভাবে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ওই আইনজীবী নিজেও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কয়েক দফা আলাপ করেন।