মিজানুর রহমান (বাবুল)
সম্পাদক, সংবাদ এই সময়
মা-বাবা দুজনেই কর্মজীবী—এটাই এখন শহুরে জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা। সেই বাস্তবতায় সন্তান ও ঘরের দেখাশোনার দায়িত্ব অনেকটাই এসে পড়ে গৃহকর্মীদের ওপর। বিশেষ করে সন্তান ছোট হলে এই নির্ভরতা আরও গভীর হয়। সকাল থেকে রাত—ঘরের কাজ, শিশুর খাওয়া, খেলা, পড়াশোনা—সবকিছুই সামলাতে হয় তাদের। অনেক পরিবারে গৃহকর্মী বাসাতেই থাকেন।
কখনো তারা বদলে যান, কখনো হঠাৎ করেই আর আসেন না। কিন্তু যতদিন থাকেন, ততদিন তারা ঘরের একান্ত ভেতরের মানুষ হয়ে ওঠেন। সন্তানের নিরাপত্তা, ঘরের চাবি, ফ্রিজের খাবার, আলমারি, পানির বোতল—সবকিছুর ওপরই তাদের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকে। কেয়ারটেকার কিংবা সিকিউরিটি গার্ডরাও সাধারণত তাদের থামান না।
এই অবাধ প্রবেশাধিকার থেকেই জন্ম নেয় একধরনের নির্ভরতা। আর সেই নির্ভরতাই কখনো কখনো ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যাদের ওপর ভরসা করে আমরা নিশ্চিন্তে অফিসে যাই, তারাই চাইলে মুহূর্তেই বিপদ ডেকে আনতে পারে—এই ভাবনাটাই শিউরে ওঠার মতো।
অনেক পরিবার নিরাপত্তার জন্য বাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসান। অফিসে বসে সন্তানের অবস্থা দেখা যায়, ঘরের কাজ ঠিকঠাক হচ্ছে কি না—এই পর্যবেক্ষণে সাময়িক স্বস্তি আসে। কিন্তু নজরদারিও সব সময় যথেষ্ট নয়। ভয়ের অনুভূতিটা রয়ে যায় মনের গভীরে।
কারণ যে ঘরটিকে আমরা সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় ভাবি, সেই ঘরেই যদি অনিরাপত্তার বীজ জন্ম নেয়, তবে আশ্রয় বলতে আর কিছু থাকে কি?
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই অনিরাপত্তাকেই আরও ভয়াবহভাবে সামনে এনে দিয়েছে। পুলিশের সন্দেহ ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, এক গৃহকর্মী নির্মমভাবে এক মা ও তার শিশুকন্যাকে হত্যা করেছে। ঘটনাটি এতটাই নৃশংস যে কল্পনাকেও হার মানায়।
সবকিছু ঘটে গেছে মুহূর্তের মধ্যে। কিন্তু রেখে গেছে অপূরণীয় ক্ষত। কর্মস্থল থেকে ফিরে বাবা দাঁড়িয়ে পড়েছেন নিঃস্ব, বাকরুদ্ধ। চোখে শুধু বিস্ময় আর শোকের ভার। শিশুটির সেদিন পরীক্ষা ছিল—সব স্বপ্ন, সব প্রস্তুতি থেমে গেল এক মুহূর্তে। একটি পরিবার চিরতরে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভিত্তি হলো বিশ্বাস। সমাজে বসবাস মানেই একে অপরকে বিশ্বাস করার দায়। কিন্তু যখন সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন চারপাশটাই অপরিচিত হয়ে ওঠে। আজ যাদের ওপর আমরা নির্ভর করি, কাল সেই নির্ভরতাই কি সন্দেহে পরিণত হবে—এই প্রশ্ন আমাদের তাড়া করে ফেরে।
তবু জীবন থেমে থাকে না। মানুষ আবারও মানুষকে বিশ্বাস করে, কারণ বিশ্বাস ছাড়া সমাজ চলে না। তবে সেই বিশ্বাস যেন অন্ধ না হয়। পরিবার, সন্তান ও ঘরের নিরাপত্তার প্রশ্নে এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বাস থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে সতর্কতার ভারসাম্য থাকা জরুরি। সমাজের সব মানুষ খারাপ নয়—এ কথা যেমন সত্য, তেমনি কিছু ঘটনা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বাস করতে হলে চোখ খোলা রাখতেই হবে।