মিজানুর রহমান বাবুল সম্পাদক, সংবাদ এই সময়
একসময় শহরের শ্যামাসুন্দরী নদী ছিল মাছের অভয়ারণ্য। আজ সেই নদীতে মাছ তো দূরের কথা, দূষিত পানিতে কোনো জলজ প্রাণীই টিকে থাকতে পারে না। পাশের ঘাঘট নদী, লালমনিরহাটের সতী নদী কিংবা দেশের উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ নদী তিস্তা—সবখানেই একই চিত্র। একসময় যেসব নদী ছিল মাছে ভরা, আজ সেসব কেবল মানুষের স্মৃতিতে আর গল্পে বেঁচে আছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে পুরো তিস্তা নদী নৌপথে ঘুরে দেখা গেছে—নদীজুড়ে মাছ ধরার নৌকার সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। যারা মাছ ধরছিলেন, তারাও উল্লেখযোগ্য কোনো মাছ পাচ্ছিলেন না। নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় এবং দূষণের কারণে মাছের স্বাভাবিক আবাস ধ্বংস হয়ে গেছে।
ঢাকার বুড়িগঙ্গা, পদ্মা-যমুনাসহ দেশের প্রায় সব বড় নদীই আজ জীববৈচিত্র্য সংকটের মুখে। ছোট নদী, বিল ও জলাশয় থেকে দেশি মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্ম এসব মাছ কখনো দেখেনি বলেই হয়তো তাদের কাছে বিষয়টি তেমন গুরুত্বও পাচ্ছে না।
শুধু মাছ নয়—নদী ও জলাশয় থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য পোকামাকড়, জোঁক, কাছিম, ভোঁদড়সহ নানা জলজ প্রাণী। একসময় নদীতে প্রচুর পটকা পোকা, জোঁক ও কাছিম দেখা যেত। আজ সেগুলো প্রায় বিলুপ্ত। কুমির, শুশুক কিংবা ডলফিনের মতো প্রাণীও আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। অথচ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলোর ভূমিকা অপরিসীম।
নদী ও জলাশয় ভরাট, শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্যে দূষণ এবং অবাধে বিষ প্রয়োগ—সব মিলিয়ে জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের এক ভয়াবহ চিত্র তৈরি হয়েছে। অনেক নদী ও জলাশয় বিল হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে লিজ দেওয়া হচ্ছে। অধিক মুনাফার আশায় লিজগ্রহীতারা বিষ প্রয়োগ করে পোকামাকড় ও ছোট মাছ মেরে ফেলছেন, এরপর মাছ চাষ করে আবার বিষ প্রয়োগে সবকিছু নিঃশেষ করছেন। এ বিষয়ে কার্যকর সরকারি তদারকির ঘাটতি স্পষ্ট।
দুঃখজনক হলেও সত্য—সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জলজ জীববৈচিত্র্য নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা কিংবা সংরক্ষণমূলক কার্যক্রম চোখে পড়ে না। যেসব নদী দূষিত বা ভরাট হয়ে গেছে, সেখানে জলজ প্রাণীর টিকে থাকার কোনো সুযোগ নেই।
মাত্র ৩০–৪০ বছরের ব্যবধানে একটি দেশ থেকে শত শত জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়। এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপর, যার চূড়ান্ত ক্ষতির বোঝা বইতে হবে মানুষকেই।
জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। যদিও সরকারের প্রধান দায়িত্ব এ ক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা নেওয়া, তবু ব্যক্তি, সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। ছোট নদী ও জলাশয়ে বিষ প্রয়োগ নিষিদ্ধ করা, প্রাকৃতিকভাবে জলজ প্রাণীর বংশবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা, জলজ প্রাণীর অতীত ও বর্তমান তথ্যভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন এবং সংরক্ষণ রূপরেখা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা হতে হবে প্রকৃতিবান্ধব। প্রকৃতির ক্ষতি করে যে উন্নয়ন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ হয়ে উঠবে। কেবল বর্তমানের স্বার্থ নয়—আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য, জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ পরিবেশ রেখে যাওয়াই একজন আদর্শ নাগরিক ও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
নইলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের নদী-জলাশয় হয়ে উঠবে প্রাণহীন, আর তার দায় থেকে কেউই মুক্ত থাকতে পারবে না।