সংবাদ এই সময় অনলাইন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনিবার্য নাম বেগম খালেদা জিয়া। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা একজন রাষ্ট্রনায়কই নন, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও বিরোধী রাজনীতির এক প্রতীক। সময়ের নানা উত্থান-পতন পেরিয়ে আজও তার নাম উচ্চারিত হয় আবেগ, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে। এই প্রজন্মের অনেক তরুণ তাকে সরাসরি ক্ষমতায় দেখেনি, আবার কেউ কেউ দেখেছে আন্দোলনের মাঠে কিংবা সংবাদ শিরোনামে। তবু দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ঘিরে তরুণদের ভাবনা, অনুভূতি ও মূল্যায়ন ভিন্ন ভিন্ন রঙে রাঙানো।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের কাছে কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন, তিনি আমাদের মাতৃতুল্য অভিভাবক। তাকে আমরা ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেই বেশি আনন্দ পাই। তিনি এক সংগ্রামের নাম, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন দেশের স্বার্থে দেশের মানুষের জন্য কীভাবে আপসহীন থাকতে হয়, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস প্রদর্শন করতে হয়, গণতন্ত্রের প্রশ্নে অটল অবস্থানে থাকতে হয় এবং দেশপ্রেম ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দায়বদ্ধতার প্রকৃত প্রতীক হয়ে উঠতে হয়।
ম্যাডামের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল ২০১০ সালে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান এবং ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক স্মরণীয় দিনে। সেই প্রথম দেখাতেই তার ব্যক্তিত্ব, দৃঢ়তা ও মমতার উপস্থিতি আমার হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ ফেলে দিয়েছিল। আজও গভীর আবেগ ও অনুভূতিতে মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা—ম্যাডামের গাড়ির পেছনে পেছনে দৌড়ে চলা স্মৃতিগুলো। ভালোবাসা আর কর্তব্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে ক্লান্তি আর কষ্টকে উপেক্ষা করে পাশে থাকার সেই মুহূর্তগুলো সারা জীবন ভীষণভাবে মিস করব।
ম্যাডাম যখনই আদালতে হাজিরা দিতে আসতেন, তখন পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেও আমরা তার গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে থাকতাম। ভয়, বাধা কিংবা হুমকি কিছুই আমাদের বিশ্বাস আর ভালোবাসাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি যখন রাজনৈতিক কার্যক্রমে বের হতেন, আমাদের মনে হতো একজন মা যাচ্ছেন; আমরা তার সন্তান হিসেবে ভ্যানগার্ডের ভূমিকায় থাকতাম।
সর্বশেষ ম্যাডামকে এভার কেয়ার হাসপাতালে কয়েকবার আনা-নেওয়ার সেই স্মৃতিগুলো, যেখানে আমি নিজেই অসহায় সময়ের নীরব সাক্ষী ছিলাম, সেই মুহূর্তগুলো আজও হৃদয়ের গভীরে নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের সাহস, আমাদের প্রেরণা, আমাদের ভালোবাসা ও বিশ্বাসের এক অবিনাশী নাম। তার জন্য এই আবেগ, এই স্মৃতি, এই ভালোবাসা সবই আমাদের সংগ্রামেরই অংশ থাকবে। তার রেখে যাওয়া আদর্শ আমরা ধারণ, লালন ও পালন করব আমৃত্যু। প্রিয় মাতৃতুল্য নেত্রীকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন এক নেতৃত্বের নাম, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে গণতন্ত্রের প্রশ্ন বড় ছিল। তিনি ভিন্ন দলের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে রাজনীতি করেছেন, এটা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরল এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভীষণ রকম জরুরি। স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যখন নিজের দল দুর্বল, তখনো তিনি অন্য দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার কাছে আন্দোলন ছিল শুধু দল রক্ষার বিষয় নয়—গণতন্ত্র রক্ষার, বাংলাদেশ রক্ষার প্রশ্ন। দেশের দুঃসময়ে আলেমদের পাশে দাঁড়ানো, শাহবাগের উত্তাল পরিবেশে শাপলা চত্বর নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া—এসব সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। স্রোতের বিপরীতে কথা বলা মানেই রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া, তবু তিনি সত্য বলার দায় এড়িয়ে যাননি। সবাই তাকে বুঝুক বা না বুঝুক, তিনি ইতিহাসের কাছে নিজের অবস্থান পরিষ্কার রেখেছেন।
খালেদা জিয়ার রাজনীতির আরেকটি বড় সৌন্দর্য তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কখনো ব্যক্তিগত শত্রু বানাননি। সংসদে হোক বা রাজপথে, তার ভাষায় ছিল সংযম। সমালোচনা করেছেন, কিন্তু শিষ্টাচার হারাননি। মতের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শ্রদ্ধার সীমা তিনি ভাঙেননি।
১৯৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারির সেই দিনটি এই নেতৃত্বের বড় উদাহরণ। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে যখন আটদলীয় জোটের নেতাকর্মীরা দিশাহারা, তখন খালেদা জিয়া নিজে ছুটে গিয়ে সেই মিছিলের নেতৃত্ব দেন। সেদিন রাজপথ দখলে ছিল, কারণ নেতৃত্বের শূন্যতা তিনি দায়িত্ব দিয়ে পূরণ করেছিলেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া তার শেষ ভাষণেও আমরা বাংলাদেশের মুক্তির বারতা দেখেছিলাম, যেখানে কারো প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই, আছে শুধু বাংলাদেশের জন্য স্বপ্ন।