মো আবদুল করিম সোহাগ
সাভার ঢাকা
সাভারে সাত মাসে ছয় জনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় পুলিশ সম্রাট নামে যাকে গ্রেফতার করেছে তার প্রকৃত নাম-পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খুনের কারণ বর্ণনাতেও আছে অসংলগ্নতা। সাভার মডেল থানার আশপাশে প্রায় সময় ঘুরে বেড়ানো সম্রাট নিজেকে ‘কিং সম্রাট এবং মশিউর রহমান খান সম্রাট‘ বলে দাবি করছে পুলিশের কাছে। সর্বশেষ গত রোববার জোড়া হত্যাকাণ্ডে তার নাম বলছে পুলিশ। সাভার থানা পুলিশ জানায়, ভবঘুরে প্রকৃতির সম্রাট গত কয়েক বছর ধরে মূলত সাভার মডেল থানার সামনে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাব রেজিস্ট অফিসের আশপাশ, সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার ও পাকিজার মোড়ে ঘোরাফেরা এবং রাত্রি যাপন করত। রবিবার পৌর কমিউনিটি সেন্টারে জোড়া খুনের পর গ্রেফতারকৃত সম্রাট নিজের যে নাম এবং ব্যাংক কলোনী এলাকায় বাড়ির যে ঠিকানা বলেছে তার সত্যতা নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ওই এলাকায় ৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট । সম্রাট নিজের পুরো নাম ওই কাউন্সিলরের পুরো নামের সঙ্গে মিলিয়ে বলছে। এদিকে, পর্যায়ক্রমে ছয় জনকে খুনের যে কারণ সে দাবী করছে তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে পুলিশের। ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত সুপার মো. আসাদুজ্জামান সোমবার বিকেলে বলেছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অজ্ঞাতনামা পাঁচজনসহ ছয় খুনের দায় স্বীকার করার পর সম্রাটকে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, “খুনের কারণ হিসেবে সম্রাট একেকবার একেক রকম দাবি করেছে। একবার দাবি করছে ওরা অনৈতিক কাজ করায় তাদেরকে সে মেরে ফেলেছে। আবার দাবি করছে, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বিভিন্ন স্থান থেকে ভবঘুরে নারীদের সে নির্জন স্থানে নিয়ে আসতো । তারা অন্য কারো সঙ্গে কিংবা অন্য কেউ তাদের সঙ্গে অনৈতিক কাজ করলে সে তাদেরকে হত্যা করতো।” সর্বশেষ ঘটনার ৩-৪দিন আগে তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে সে কমিউনিটি সেন্টারে এনে রাখে। ওই তরুণীর সঙ্গে আরেক ভবঘুরে যুবক অনৈতিক সম্পর্ক করলে প্রথমে তাকে কমিউনিটি সেন্টারের দোতালায় নিয়ে মেরে ফেলে সম্রাট। এরপর ওই ভবঘুরে তরুণীকে নিচতলায় হত্যা করে। তারপরে লাশ পুড়িয়ে ফেল। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরো জানান, সম্রাটের বক্তব্য কতটা সত্য তা যাচাই করা হচ্ছে। ঢাকা জেলার ডিবির (উত্তর) পরিদর্শক সাইদুল ইসলাম বলেছেন, সম্রাট তার বাড়ির ঠিকানা দিয়েছে পৌর এলাকার ৫ নং ওয়ার্ডের ব্যাংক কলোনি এবং তার বাবার নাম মৃত সালাম এবং মৃত রেজেয়া। এসব কিছু যাচাই-বাছাই না করেই তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আরমান আলী জানান, সম্রাট একজন বিকৃতরুচির মানুষ, সাইকো প্যাথ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের নেত্র বিজনেস সেন্টারের মালিক সুবল রায় বলেছেন, তিন চার বছর ধরে এই ভবঘুরে সেখানে আসা-যাওয়া করে নিয়মিত। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা চেয়ে তার দিন চলে। থানার সামনে চৌরাস্তা মোড়ের ডাব বিক্রেতা জুয়েল জানান, অনেক পুলিশের কাছ থেকে এই সম্রাট নিয়মিত চেয়ে টাকা নিত। অনেক গণমাধ্যমকর্মীও তাকে চা সিগারেট খাওয়ায়। থানার মূল ফটকের বাহিরে পোস্ট অফিসের পাশে মনিরের হোটেলে প্রায়ই খাওয়া-দাওয়া করে সে। অনেক সময় তার হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল দেখা যেত। তবে একটি বাটন ফোন সার্বক্ষণিক থাকতো। অপরিষ্কার থাকতেন তিনি এবং সার্বক্ষণিক উচ্চবাচ্য করে গালিগালাজ করতেন। সাব রেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিলের কাজে সম্পৃক্ত রুবেল পাঠান জানান, মাঝেমধ্যেই তাকে তিনি চা সিগারেট খাওয়াতেন। তবে তিনি যে একজন ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার তা কখনো ধারণাও করতে পারেননি। থানার সামনের বাড়ি মালিক আব্দুর রহিম জানান, “৬ খুনের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত এই ভবঘুরে চিৎকার চেঁচামেচি করত প্রায় সময়। বিভিন্ন সময় পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর পুরানো ড্রেসও পড়তো সম্রাট। এখন সে পুলিশকে ভুয়া তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।” ব্যাংক কলোনি এ এবং বি ব্লকের একাধিক স্থায়ী বাসিন্দার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সম্রাট যে ঠিকানা এবং পুরো নাম বলছে তা সঠিক নয়, ভুয়া। তিনি ব্যাংক কলোনীর কোন বাসিন্দা নয় বলে নিশ্চিত করেছেন কমিউনিটি এবং বিট পুলিশের একাধিক সদস্য। সাত মাসে ৬ খুন : ৭ মাস আগে ৪ জুলাই সাভার মডেল মসজিদের সামনে অজ্ঞাতনামা এক বৃদ্ধার (৭৫) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার নাতি মামলা দায়ের করলে পরে আসমা বেগম নামের এই বৃদ্ধার পরিচয় মিলে। এরপর ২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট পৌর এলাকার পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে অজ্ঞাতনামা এক পুরুষের (৩০) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই স্থানে ১১ অক্টোবর অজ্ঞাতনামা এক মহিলার (৩০) মরদেহ পাওয়া যায়। এরপর ১৯ ডিসেম্বর সেখান থেকে অজ্ঞাতনামা আরো এক পুরুষ পুরুষের (৩৫) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এসব ঘটনা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করলে কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশে সিসিটিভি এবং লাইট লাগানো হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। সর্বশেষ ১৮ জানুয়ারি রোববার পুলিশ দুটি পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে। এর পর সিসিটিভি ফুটেজে একটি মরদেহ সরাতে দেখা যায় সম্রাটকে। তারপর পুলিশ তাকে আটক করে। যদিও ওই তদন্তের সময় পুলিশের সঙ্গে ছিল সম্রাট।
স্বীকারোক্তি দিয়ে কারাগারে: জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট ৬টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।সোমবার সম্রাটকে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে ৬ হত্যা মামলার আসামী সম্রাট। জবানবন্দি শেষে তাকে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। সোমবার সন্ধ্যায় এ তথ্য নিশ্চিত করেন আদালত পুলিশের পরিদর্শক কামাল হোসেন। সিরিয়াল কিলারের প্রকৃত নাম ঠিকানা : একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নিজেকে সম্রাট বলে পরিচয় দেওয়া এই সিরিয়াল কিলারের প্রকৃত নাম হচ্ছে সবুজ শেখ । তার বাবার নাম পান্না শেখ। তারা তিন ভাই চার বোন। বড় বোন শারমিন। দ্বিতীয় সবুজ শেখ। তারপর আরেক বোন ও আরেক ভাই। তারপরে আরো দুই বোন। তাদের নানা বাড়ি বরিশালে। সবুজের জন্মস্থান এবং বাবার বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার
হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা
গ্রামে। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী খালেক শেখ তাদের আত্মীয়। গ্রামের সবাই তাদেরকে ভয়ংকর হিসেবে চিনে। সাভার মডেল থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা মঙ্গলবার ভোররাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এদিকে, কারামুক্ত একাধিক হাজতি জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে এই সম্রাট কাশিমপুর-২ কারাগারে ৬০ নম্বর সেলের পূর্ব বিল্ডিং এর নিচতলায় বন্দী ছিল। কারাগারের ভেতর সে ছিল বেপরোয়া। প্রায়ই চুরি করত। কারা কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়ে ছিল উদ্বিগ্ন।