সাইদুজ্জামান
গত মঙ্গলবার জাহানারা আলমের বিস্ফোরক একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল কালের কণ্ঠে। সেদিনই সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নারী দলে অনাচার-অবিচার নিয়ে সাবেক অধিনায়কের বক্তব্যকে বানোয়াট বলে উড়িয়ে দেয়।
বেশ কিছু মানুষের এবং চলমান সিস্টেমের সমালোচনা করেছিলেন জাহানারা। সেসব খতিয়ে দেখার জন্য অন্তত কয়েকটি দিন সময় লাগার কথা।
কিন্তু এক বেলায়ই বিসিবি সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায় যে সব বানোয়াট! আদতে সংস্থার পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। সমালোচনার তীর যখনই বোর্ডের গায়ে বিঁধে, তৎক্ষণাৎ তা অস্বীকার করা হয়। এটাকে বিসিবির শঠতা বলতে পারেন, তবে আমার কাছে মনে হয় নির্বুদ্ধিতা। নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ তো বিসিবি হাতেনাতে পেয়ে গেছে।
এক দিন পর একটি ইউটিউব চ্যানেল জাহানারা যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলার পর সেদিন গভীর রাতে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায় যে যৌন হেনস্তার অভিযোগ যেহেতু স্পর্শকাতর, সেহেতু তদন্ত কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি।
ওয়েল, বিসিবির প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়েছে, যৌন নিপীড়নের ঘটনা ছাড়া সংস্থাটি আর কোনো ঘটনাকে আমলে নেবে না! কারণ ইউটিউব চ্যানেলে জাহানারার যৌন হেনস্তার অভিযোগের সঙ্গে দলীয় কোন্দল এবং অন্যান্য অভিযোগ কালের কণ্ঠেও ছাপা হয়েছিল। তার মানে জাতীয় দলে একাধিক গ্রুপ, কর্তৃত্ববাদী অধিনায়ক, টিম কর্মকর্তাদের অসুস্থ পক্ষপাতের অভিযোগকে গুরুত্ব দেয় না বিসিবি। অভিভাবক সংস্থার এ কেমন আচরণ! তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক যে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে এসব বলছেন জাহানারা।
কিন্তু সাবেক একজন অধিনায়কের এমন অভিযোগ তদন্ত করে দেখবে না বিসিবি? আশ্চর্য! যা-ই হোক, এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি কর্মব্যস্ত থাকার কথা বিসিবির নারী বিভাগের। কিন্তু সেটির প্রধান সাবেক ক্রিকেটার আব্দুর রাজ্জাক এখন সিলেটে, ছেলেদের দলের টিম ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। একটু অবাক লাগছে না? যিনি নারী বিভাগের প্রধান, তিনি আবার ছেলেদের দলের পরিচালক! অবশ্য রাজ্জাক একেবারে নীরব থাকেননি। গত পরশু একটি টিভি সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, একজন মানুষের এতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ কেন? এমন ন্যারেটিভ শুনলে মনে হয়, যিনি অভিযোগ করেছেন, মূল সমস্যা তাঁর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মিথ্যা ভাষণ দিয়ে অপরাধী জাহানারা!
যত দূর খবর, কাগজে-কলমে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও বিসিবির পক্ষ থেকে তীব্র চেষ্টা চলছে জাহানারার অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণের।
টুর্নামেন্টের কারণে নারী দলের সব ক্রিকেটার এখন ঢাকার অদূরে বিকেএসপিতে। তাঁদের কাছে মুখে কুলুপ আঁটার নির্দেশ সংবলিত ফোন যাচ্ছে। এত নিশ্চিত করে বলার কারণ, গতকাল জাহানারার প্রথম সাক্ষাৎকার নেওয়া মাসুদ পারভেজকে তিনজন নারী ক্রিকেটার নাম গোপন রাখার শর্তে ভাষ্য দেবেন বলেছিলেন। কিন্তু বিকেলের পর থেকে তাঁরা অসহায়ত্বের কথা বলে হাত গুটিয়ে ফেলেন।
এটাই নারীর প্রতি সমাজপতিদের ‘সুবিচার’! নারী দলের ভেতরে কিছু হয়, এই গুঞ্জন প্রাচীনকালের। দলটির সাবেক নির্বাচক মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে পত্রপত্রিকায় খবরও হয়েছিল। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সানে শিরোনামে তাঁর চরিত্রে ‘পারভারশন’ জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে মঞ্জুরুলকে পদ হারাতে হয়েছিল। অবশ্য বিসিবিতে আদি কাল থেকেই একটা সিন্ডিকেট চলমান। পক্ষের লোকের সব ভুল মাফ। সেই নিয়ম মেনে মঞ্জুরুলকে অন্য একটি কমিটিতে পদায়ন করা হয়।
অদ্ভুত শোনাচ্ছে? তাহলে জানুন, জাহানারা দফায় দফায় অভিযোগ করেছেন বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী এবং তৎকালীন নারী বিভাগের প্রধান শফিউল আলম চৌধুরীর কাছে। তাঁরা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেননি। কেন নেননি? সিন্ডিকেট? এক মঞ্জুরুলকে শাস্তি দিলে বাকি আরো নাম সামনে চলে আসত? গত ৪৮ ঘণ্টায় জাহানারার বক্তব্যকে ব্যক্তিগত আক্রোশ প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে ইনিয়ে-বিনিয়ে যত কথা শুনেছি, তা বিস্ময়কর। ঘটনার সত্য-মিথ্যা পরে। ঘটনার সত্যতা আমি যেমন জানি না, ফোন যাঁরা করেছেন, তাঁরাও জানেন না। তাহলে তাঁদের এই অপলাপের উদ্দেশ্য কী? ধরে নিলাম, বোর্ডের ও নারীদের সম্মান রক্ষার্থে এই চেষ্টা তাঁরা করছেন। কিন্তু এমন গুরুতর অভিযোগ ধামাচাপা দিয়ে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়। ভাবমূর্তি রক্ষার নামে নিপীড়ন সয়েই মেয়েদের খেলতে হবে? এ তো মধ্যযুগীয় চিন্তা, এই চিন্তার আড়ালেই লুকিয়ে একেকজন নিপীড়ক!
নিপীড়ন দেশের অন্য খেলায়ও চলে, চলছে। সম্প্রতি বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলে এক নারী শ্যুটারের ফাঁস করা অডিও শুনছিলাম। সেখানে এক বুড়বক সংগঠক ফোনে ওই নারী শ্যুটারকে বলছেন, ‘শোনো, সবকিছুই গিভ অ্যান্ড টেক। তুমি লজ্জা ঢাকার জন্য কাপড় কেনো না, নাকি ফ্রি পাও?’ ভাবা যায়, একজন মধ্যবয়সী সংগঠক একজন উঠতি শ্যুটারকে এসব বলছেন! খোঁজ নিলে অন্য খেলায়ও এমন ঘটনা জানা যাবে।
এখন উপায়? উপায় একটাই—আওয়াজ তোলা। ক্রীড়াঙ্গনের নারীরা আওয়াজ তুলুন। প্রকাশ্যে সম্ভব না হলে ফোন ঘোরান কালের কণ্ঠের ক্রীড়া বিভাগে।
আর বিসিবির প্রতি পরামর্শ, আপনারা অবান্তর বিজ্ঞপ্তি প্রচারের নামে আগুনে হাত দেবেন না!