মতামত ডেস্ক।
১৯৯১ সালে নির্বাচনী প্রচারণার সময় খালেদা জিয়া
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারণ করলে একটি দীর্ঘ অধ্যায় সামনে উন্মোচিত হয়। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংগ্রামের পথ, রাষ্ট্র পরিচালনার ভার, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তা এবং বিরতিহীন প্রতিযোগিতার রাজনীতি। অথচ আজ, ২০২৫ সালের প্রাক-নির্বাচনী প্রহরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখলে দেশের কোটি মানুষের মনে এক অদ্ভুত ব্যথা, শূন্যতা আর স্মৃতির ঢেউ এসে আঘাত করে। কারণ, তিনি এবার নির্বাচন করছেন ঠিকই, তিনটি আসন থেকে প্রার্থীও হয়েছেন; কিন্তু সেই পুরনো দৃশ্য—রাস্তার মেঠোপথে তিনি, মানুষের হাতে হাত, রোদ-বৃষ্টি-ধুলা-মাটি মেখে জনতার মাঝখানে বেগম জিয়া—সেসব আর নেই। সময় তাকে ধীরে ধীরে অনেকটাই থামিয়ে দিয়েছে।
রাজনীতির ময়দানে শুধু প্রার্থিতা নয়, উপস্থিতিই সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু এবার তিনি উপস্থিত থাকবেন নাম দিয়ে, প্রতীক দিয়ে, স্মৃতি দিয়ে—সশরীরে নয়। এখানে শুধু রাজনীতির কথা নেই, আছে এক মানুষকে সময় কীভাবে গ্রাস করে তার নির্মম স্বাক্ষরতার দৃশ্যপট।
মনে পড়ে যায় ২০০৮ সালের সেই নির্বাচনের কথা। ওয়ান-ইলেভেনের বন্দিত্ব থেকে মুক্তির পর, সীমিত সময় হাতে পেয়েও কী দুর্দান্ত প্রচারণা চালিয়েছিলেন বেগম জিয়া! তিনি ছিলেন মাঠের নেতা—লক্ষ মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে স্বর তুলতেন, চষে বেড়াতেন শহর থেকে গ্রাম। ওয়ান-ইলেভেন ঝড়ে বিএনপি তখন ছিল বড় বিপর্যয়ের মধ্যে, কিন্তু বেগম জিয়া ছিলেন অবিচল। আবার সেই সময়কার অপর প্রান্তে দেখা যায় ভিন্ন এক দৃশ্য—শেখ হাসিনা রাজধানীর বিলাসী পরিসরে, সোনারগাঁও হোটেলে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে আলোচনায়। তার কথাগুলো তখনই ইঙ্গিত করেছিল ফলাফলের পূর্বনির্ধারণের আভাস: “কী চাও তোমরা? পদ্মা সেতু? উড়ালসেতু? মেট্রোরেল? বল…” সেই দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দা পেরিয়ে তখন অনেকের মনে ঠিক এমন প্রশ্নই জাগিয়েছিল—এবারের নির্বাচন কি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ? নাকি অনেক আগেই সব ঠিক হয়ে গেছে?
ইতিহাসকে পরে বিচার করা যায়। এবং সে বিচার বলে, ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল ক্ষমতা-সমঝোতা আর প্রাতিষ্ঠানিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইতিহাস। মঈন ইউ আহমেদ ও তখনকার সেনা-সমর্থিত শক্তির হিসাব-নিকাশে দেশকে যেদিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানে বেগম জিয়া ছিলেন একা। তার প্রতিবাদ ছিল দৃঢ়, সাহসী, কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম।
এরপর কেটে গেছে প্রায় সতেরো বছর। রাজনীতির মঞ্চ পাল্টেছে, চরিত্র বদলেছে, সময় বদলেছে, নেতৃত্বের ভাষা ও ভঙ্গি বদলেছে। কিন্তু বেগম জিয়া? তিনিও বদলেছেন, তবে তা রাজনৈতিক কারণে যতটা, তার চেয়ে বেশি বদল হয়েছে সময়ের কারণে। বয়স, অসুস্থতা এবং চিকিৎসা—এই তিনটি শব্দ যেভাবে ধীরে ধীরে এক কিংবদন্তি নেত্রীর গতিপথকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে, তা শুধু রাজনৈতিক নয়; তা মানবিক, ব্যক্তিগত ও বেদনাদায়কও বটে।
এবারের নির্বাচনকে তাই অনেকে বলছেন—স্মৃতির নির্বাচন। শুধু বেগম জিয়ার জন্য নয়, বিএনপির অনেক প্রবীণ নেতার জন্যও। হয়তো এও হতে পারে মির্জা ফখরুল ইসলামের রাজনীতির শেষ প্রান্ত। কয়েকদিন আগে তিনি এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন। হয়তো আরও কয়েকজন দীর্ঘপ্রত্যাশী, নিষ্ঠাবান রাজনীতিক এ নির্বাচনের পর নিজেদের ভূমিকা নতুনভাবে ভাববেন। তাই এ নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই নয়; এ হলো এক প্রজন্মের নেতৃত্বের বিদায়ের সীমানায় দাঁড়ানো নির্বাচন।
কিন্তু তবু প্রশ্ন আছে, প্রত্যাশা আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে। এবার যদি তিনি জেতেন, তিনি কি মঞ্চে দাঁড়িয়ে আগের মতো অগ্নিঝরা বক্তৃতা দিতে পারবেন? যে বক্তব্য শুনে মানুষ জেগে উঠবে, তার কণ্ঠ কি এখনও তেমন করে জনতার মাঝে ঢেউ তুলতে পারবে? হয়তো তিনি পারবেন, হয়তো পারবেন না। কিন্তু জাতির হৃদয় এখনো অপেক্ষায় তার দেশপ্রেমের বাণী শুনতে।
বেগম জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন; তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র সংগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে ভারী নামগুলোর একটি। তিনি শুধু তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি একজন মা-রূপী প্রতিকৃতি, বিরোধী রাজনীতির প্রতীক, রাষ্ট্রক্ষমতার উচ্চ আসন থেকে সরে আসার পরও দাঁড়িয়ে থাকা ধৈর্যের প্রতিচ্ছবি। সময়ের স্রোতে মানুষ বদলায়, এটাই নিয়ম। কিন্তু ইতিহাস বদলায় না; ইতিহাস শুধু নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে।
আজ যখন তাকে দেখি—ধীর পায়ে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা বুকে নিয়ে বেগম জিয়া রাজনীতির মাঠে আবার সরব হতে চান, তখন মনে পড়ে যায় ৯১ সালের জাতীয় সংসদে আনা অনাস্থা প্রস্তাবের কথা। কী অদম্য দৃঢ়তায় তিনি সেই আঘাত ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন! তখনকার বেগম জিয়া ছিলেন ঝড়ের মতো, রোদের মতো, ঢেউয়ের মতো। আজ তিনি সেই রোদেই ক্লান্ত, সেই ঢেউয়ের পরবর্তী নীরবতা।
কিন্তু শ্রদ্ধা? বা ভালোবাসা? অথবা স্মৃতি?—এসবের কি বয়স হয়?
জাতি তার কণ্ঠ শুনতে চায়। চায় হয়তো শেষবারের মতো, হয়তো নতুন শুরু দেখতে চায়। কিন্তু সময়ের নিজের ভাষা আছে। সময়ের নিজের তাড়না আছে। শুধু মনে হয়— কীভাবে সময় চলে যায়! চলে যায় আর আমাদের জীবন বদলে দিয়ে যায়। যেমন বদলে দিয়েছে বেগম জিয়ার জীবন, যেমন বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতি।
এ নির্বাচন তাই কেবল ভোট নয়; এ নির্বাচন হলো স্মৃতি, অস্তিত্ব, অভিমান এবং ইতিহাসের আরেক দফা বিচার। বাকিটা রেখে দেওয়ার ভার সময়ের কাছে। সময়ের কাছেই রেখে গেলাম সেই ভার।
আমরা ইতিহাসের এক উত্তরণের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে স্মৃতি, আবেগ, রাজনীতি এবং সময় একে অন্যকে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে। সেখানে এই নির্বাচন শুধু নির্বাচন নয়, এটি বিদায়ের সম্ভাব্য সংগীত।
কায়মনোবাক্যে দোয়া করি, মাতৃসম বেগম খালেদা জিয়া যেন সুস্থ হন, ফিরে দাঁড়ান, আর আমরা আরেকবার তার কণ্ঠ শুনতে পারি।
শেষে শুধু দোয়া: আল্লাহ তাকে সুস্থতা দান করুন। জাতি যেন আবার তার কণ্ঠ শুনতে পারে। এই স্মৃতি যেন বিদায়ের নয়, বরং আরেকবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্মৃতি হয়ে থাকে।
সিরাজুল ইসলাম: সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক