1. news@sangbadeisomoy.com : সংবাদ এই সময় : সংবাদ এই সময়
  2. info@www.sangbadeisomoy.com : সংবাদ এইসময় :
ঢাকা শহরে কবরের দাম ফ্ল্যাটের চেয়ে বেশি: কেন? - সংবাদ এইসময়
শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:০৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
মিল্কিওয়েতে সাদা নক্ষত্রের অদ্ভুত আচরণে বিস্মিত বিজ্ঞানীরা মদ বিক্রেতা ও পানকারীদের প্রতি ইসলামের কঠোর বার্তা শ্রীবরদীর ভেলুয়া বাজারে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতা সভা অনুষ্ঠিত সাভার স্বর্ণকলি আদর্শ বিদ্যালয়ে পিঠা উৎসব অনুষ্ঠিত নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে কোনো লাভ হবে না : রিজওয়ানা বাগমারায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা দোয়া মাহফিল রোয়াংছড়িতে এনসিপি’র নবগঠিত কমিটির পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত। আমাদের বেতনের টাকা আসে স্পন্সর ও আইসিসি থেকে: মিরাজ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল ই/সরায়েল ফটিকছড়িতে মনোনয়ন ফিরে পেলেন রবিউল হাসান তানজিম

ঢাকা শহরে কবরের দাম ফ্ল্যাটের চেয়ে বেশি: কেন?

  • প্রকাশিত: সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৯৭ বার পড়া হয়েছে

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব এবং দাউদ ইব্রাহিম হাসান

অর্ণব এর গান এর মতো ‘এই শহর আমার, এই মানুষ আমার…’ এই শহর, ঢাকা! ইট-পাথরের এক বিশাল সমুদ্র, যেখানে বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্ত যেন সংগ্রামের কবিতা। কিন্তু যেন এই সংগ্রাম শেষ হয় না—শেষের ঠিকানা খুঁজে পাওয়াটাও কঠিন। কত অদ্ভুত নিয়তি! যেখানে মানুষ এক টুকরো ফ্ল্যাটের জন্য জীবনপাত করে, সেই শহরেই শেষ শয়নের জায়গার দামও ফ্ল্যাটের দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যায়। আলোচনাটা শুধু অর্থের নয়; এটি মানুষের জীবনের নির্মম পরিহাস, যেখানে ধনী-গরিবের ফারাক শুধু জীবনের ভোরের সময়ে নয়, মৃত্যু পরেও ছাড়ে না।

ঢাকা শহরের কেন্দ্রে, প্রায় ৭৪ বিঘার বিশাল জায়গাটুকু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজিমপুর সরকারি গোরস্থান। ১৯১১ সাল থেকে সিটি করপোরেশন এর দায়িত্বে থাকলেও, এই চিরশান্তির স্থানটি যেন এক অশান্ত বাজারের নাম। কারণ, এখানে শেষ ঠিকানা কারো স্থায়ী হয় না। ভাবুন তো একবার, মৃত্যুর পরও আপনাকে মাসিক ভাড়া গুনতে হচ্ছে! অথচ কবরের ভেতরে শুয়ে থাকা মানুষটি তো আর তা দিতে পারছেন না। সেই ভার এসে পড়ে তার প্রিয়জনদের কাঁধে। এখানেই শুরু হয় ধনী আর গরিবের কবরের মূল্যের পার্থক্য, যা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক নিদারুণ চিত্র।

আজিমপুরে কবরের সঠিক কোনো স্থির হিসাব নেই, কারণ এখানে প্রতিদিনই কবর বাড়ে, আবার কমেও। পরিসংখ্যান বলছে, এখানে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি লাশ দাফন করা হয়। মাস শেষে এই সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৭৫০ থেকে ৯০০-এর মধ্যে। আর বছরের শেষে তা প্রায় ৯ হাজার থেকে ১০,৮০০ লাশের সংখ্যায় এসে দাঁড়ায়। এই বিপুল সংখ্যক লাশ দাফনের সরকারি খরচও কিন্তু আলাদা। বড় লাশের ক্ষেত্রে এই খরচ ১৬৯২ টাকা এবং ছোটদের জন্য ১১৫০ টাকা। কিন্তু এই ‘স্থায়ী ঠিকানা’র মেয়াদকাল মাত্র ১৮ মাস! হ্যাঁ, দেড় বছর পর কবর তুলে নতুন কাউকে সেখানে জায়গা দেওয়া হবে। ভাবা যায়, মাত্র দেড় বছরের জন্য এই টাকা!

এখানেই শেষ নয়। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা কবরের জায়গা লিজ নিতে পারেন, তবে তার জন্যও রয়েছে চার ধাপে মোটা অঙ্কের মূল্য। ১০ বছরের জন্য ৫ লাখ, ১৫ বছরের জন্য ১০ লাখ, ২০ বছরের জন্য ১৫ লাখ, এবং ২৫ বছরের জন্য ২০ লক্ষ টাকা। এই অর্থ গুনতে হয় শোকাহত পরিবারকে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে বাস্তবতার ভিন্নতায়। কাগজে-কলমে আর মুখে মুখে যা বলা হয়, মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। অনেক পরিবার অভিযোগ করে যে, মাত্র ছয় মাস পরেই এসে তারা তাদের প্রিয়জনের নির্দিষ্ট কবর খুঁজে পান না! আর এই লিজ সম্পত্তি পেতে হলে প্রয়োজন হয় শক্তিশালী লবিং-এর, দিতে হয় মাসে মাসে ‘বকশিশ’, যা কিনা এক প্রকার ঘুষ। যেন মৃত্যুর পরও প্রিয়জনের সম্মানটুকু রক্ষা করতে একদল অসৎ মানুষের কাছে মাথা নোয়াতে হয়! এখানেই এসে বাসা বেঁধেছে রাজনীতির সিন্ডিকেট। বিগত বছরগুলোতে এখানে গড়ে উঠেছে চাটাই ব্যবসা, মাটির ব্যবসা, এবং সবচেয়ে জঘন্য কঙ্কাল চুরির ব্যবসা। ভালো বা ‘কমফোর্টেবল’ জায়গায় কবরের স্থান পাইয়ে দেওয়ার জন্যও এখানে একদল চক্র কাজ করে, যা আমাদের মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কেই তুলে ধরে।

যদি আজিমপুর হয় মধ্যবিত্তের শেষ গন্তব্যের সংগ্রাম, তবে বনানী কবরস্থান হলো ঢাকা শহরের সেই বিলাসবহুলদের জন্য তৈরি ‘ভিআইপি গোরস্থান’। এখানে গেলেই বোঝা যায়, কবরে কবরেও যে ভেদাভেদ হয়—বাংলাদেশেই তার সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ মেলে। এটি যেন মরণের পরেও সমাজের উচ্চ শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত এক বিশেষ এলাকা।

বনানী কবরস্থানে জমিটি লিজ দেওয়া হয় আরও আকাশছোঁয়া মূল্যে। এখানে ১৫ বছরের জন্য এক কোটি টাকা এবং ৩০ বছরের জন্য দেড় কোটি টাকা দিতে হয় লিজ বাবদ। এই টাকা সরাসরি সিটি করপোরেশনের মেয়রের তহবিলে জমা হয়। এই কবরস্থানের চিত্র আজিমপুরের চেয়েও আলাদা। এখানে কবরের মেয়াদকাল মাত্র দুই বছর। এই অল্প সময়ের জন্য এত বিপুল অর্থ! এছাড়া, কবর খোদা এবং বাঁশের চাটাইয়ের জন্য রয়েছে আড়াই হাজার টাকা এবং একটি সরকারি ফি ৫০০ টাকা। তবে, যদি কেউ ‘খুশি হয়ে’ কিছু দিতে চায়, তবে তাকে আরও বেশি টাকা গুনতে হয়, যা ছোটদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হলেও, বড়দের ক্ষেত্রে এই অঙ্কটা আরও অনেক বড় আকারে দাঁড় করায়। সাধারণ দাফনের পর দরখাস্ত করে লিজ নেওয়া বা কবরের আধুনিকায়নের জন্য দর কষাকষির মাধ্যমে একটি দল ফিট করা হয়। এই কবরস্থানে প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার লোকের কবরের জায়গা রয়েছে, কিন্তু এটি মূলত সমাজের সেই শ্রেণির মানুষের জন্য, যারা জীবনভর সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন, আর মরণের পরেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

অন্যদিকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে, অন্যদিকে, বুদ্ধিজীবি মিরপুর কবরস্থানে ঢাকার এই জনাকীর্ণ নগরী যেন জীবন-মৃত্যুর এক নীরব নাট্যশালা। প্রতিটি মুহূর্তে জীবনের সংগ্রামের কবিতা বাজে, আর মৃত্যুর পরও সেখানে জীবন চলে বাণিজ্যের খেলায়। মিরপুর কবরস্থান—এটি কোনো চিরস্থায়ী ঠিকানার প্রতিশ্রুতি নয়; বরং দামের লেনদেন ও সুযোগের জটিল চক্র। ধনী পরিবার কয়েক বছরের জন্য লিজের মাধ্যমে কোটি টাকার বিনিময়ে ‘স্থায়ী’ স্থান sichern করতে পারে, আর মধ্যবিত্ত পরিবার ১৮ মাসের জন্য সরকারী খরচ মেটিয়ে প্রিয়জনকে শয্যা দিতে বাধ্য। এখানে মৃত্যু ও বেঁচে থাকার মধ্যে ধনী-গরিবের ফারাক চিরন্তন—মাটির নিচেও। যদিও কবরের মাটি সকলের জন্য সমান, মর্যাদা, দাম ও সুযোগের লড়াই অব্যাহত থাকে। মিরপুরের এই চিত্র যেন ঢাকার নগর, অর্থনীতি ও সমাজের এক কড়া আয়না, যেখানে শেষ ঠিকানার লড়াইয়েই মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পরীক্ষা হয়।

এই কবরস্থানগুলোর ব্যবধান আসলে আমাদের সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। একদিকে দেড় বছরের জন্য সামান্য খরচে দাফন, অন্যদিকে কোটি টাকা খরচ করেও অস্থায়ী শয্যা। কিন্তু একটা জিনিস আমাদের সবার মাথায় রাখতে হবে, কবরের আযাব কিন্তু দামি কবর বা কম দামি কবর অনুযায়ী হবে না। মাটির নিচের ঠিকানাটা সবার জন্য সমান। সেখানে কোনো লবিং, কোনো সিন্ডিকেট, বা কোনো বকশিশের কাজ হয় না।

এই দালান, এই খ্যাতি, এই অর্থ—সবকিছুই এই মাটিতে মিশে যাবে। কবরের অন্ধকারে ধনী-গরিব, ক্ষমতাশীল-ক্ষমতাহীন সবাই একাকার। এই জীবনের দৌড়ঝাঁপ, শেষ ঠিকানা নিয়ে এত দর কষাকষি, এত ঘুষ-দুর্নীতি—এর শেষ কোথায়? যখন দেখি যে কবরের মাটি নিয়েও ব্যবসা হয়, তখন প্রশ্ন জাগে, তবে আমরা কিসের পেছনে ছুটছি? আমরা কি এই নশ্বর জীবনের মূল সুরটা ভুলে যাচ্ছি না? ‘একদিন মাটির ভেতরে হবে ঘর, কেন বানাও দালান ঘর!’

আর কতকাল এই মায়ার বাঁধনে আমরা নিজেদের ভুলিয়ে রাখব? যেখানে আমাদের শেষ ঠিকানাও টাকার অঙ্কে মাপা হয়, সেখানে কিসের অহংকার! জাগো হে মানুষ, জাগো! ধন-সম্পদের এই মোহ ত্যাগ করে একবার চোখ মেলে দেখো, তোমার শেষ গন্তব্যটা কতটা সাধারণ! যেদিন মাটির গভীরতা সব ভেদাভেদ মুছে দেবে, সেদিন শুধু তোমার কর্মই তোমার সঙ্গী হবে। তাই আজ থেকেই শুরু হোক জীবনের মূল্যবোধের হিসাব, কারণ, শেষ বিচারের দিনে কোনো ‘ভিআইপি কবর’-এর বিশেষ ছাড় মিলবে না!

লেখক: ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট গ্রুপে গ্লোবাল কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত আছেন।

দাউদ ইব্রাহিম হাসান, বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগে একজন নিয়মিত মাস্টার্স স্টুডেন্ট হওয়ার পাশাপাশি ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি আইডিএলসি ফাইনান্স পিএলসি -তে মার্কেটিং বিভাগে কর্মরত আছেন।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট