হাসান আলী
সমাজে পুরুষকে আমরা প্রায়ই দেখি এক অবিচল স্তম্ভ—যেন তার কাঁধেই বহন করতে হবে দায়িত্ব, ত্যাগ, অপরাধবোধ, ব্যর্থতা—সবকিছুর ভার। চিরকালীন ধারণা হলো পুরুষ মানেই শক্ত, স্থির, নির্ভীক; তার যেন দুঃখ থাকতে নেই, ব্যথা থাকতে নেই, কাঁদার তো প্রশ্নই ওঠে না। অশ্রুর মালিকানা নারীর, আর পুরুষের ভাগে আছে নীরবতা। এই নীরবতাই আজ পুরুষকে করেছে সমাজের সবচেয়ে ভুল বোঝা সত্তা।
মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতিকে যখন লিঙ্গ দিয়ে ভাগ করা হয়, তখনই অন্যায়ের বীজ বপন করা হয়। আমরা ভুলে যাই—পুরুষও মানুষ, তারও কষ্ট আছে, অপমান আছে, হৃদয় ভাঙার ব্যথা আছে। কিন্তু সমাজে আজ এমন এক বর্ণনাহীন চাপ—পুরুষ ব্যথা বলবে না, বললেও কেউ শুনবে না। কারণ অভিযোগ উঠেছে এমন একটি ধারণা—“পুরুষ মানেই দোষী, নারী মানেই ভুক্তভোগী।
” এই একরৈখিক দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অন্যায়ই নয়—এটি ন্যায়ের পরিপন্থী।
হ্যাঁ, নারীর ওপর নির্যাতন বাস্তব এবং ভয়াবহ, কিন্তু তাই বলে পুরুষের দুরবস্থা অস্বীকার করার অধিকার কারো নেই। বহু সংসারে পুরুষ নিরীহ, পরিশ্রমী, প্রতিদিন পরিবারের সুখের জন্য নিজেকে নিঃশেষ করেন। তারা আবেগ গোপন করে বাঁচেন, অপমান-আঘাত সহ্য করেন, ভেঙে পড়েন—তবুও সমাজ তাদের দুর্বল হতে দেয় না।
কারণ পুরুষকে অশ্রু ফেলার অধিকার সমাজ দেয়নি।
আরো ভয়াবহ হলো আইনি কাঠামো। বাংলাদেশে এমন বহু ঘটনা আছে, যেখানে পারিবারিক সমস্যার পর পুরুষ বিচার চাইতে গেছেন, আর ফিরে পেয়েছেন মিথ্যা যৌতুক মামলা, মিথ্যা নির্যাতনের অভিযোগ কিংবা প্রতিশোধমূলক ফৌজদারি মামলা। নারীর অধিকার রক্ষার জন্য যে আইনগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো অপব্যবহার হলে পুরুষের জীবনের চাকা থেমে যায়। আদালত, থানা, সমাজ—সব জায়গায় তখন পুরুষ শুধু আসামি, আর কিছু না।
অথচ একই সময়ে কোনো পুরুষ মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলে তার যাওয়ার জায়গা নেই, আশ্রয় নেই, অভিযোগ করার সাহস নেই। নৈতিক চাপ, সামাজিক কটূক্তি এবং আইনি অনিশ্চয়তা তাকে নীরব করে দেয়।
সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দেখা যায় বড় বৈপরীত্য। স্বেচ্ছায় সম্পর্ক থাকলেও সম্পর্ক ভেঙে গেলে অনেক সময় পুরুষের দিকে ধাবিত হয় ধর্ষণ বা জোরজবরদস্তির অভিযোগ। যে সম্পর্কে দুই পক্ষের সম্মতি ছিল, বিচ্ছেদের পর সেই পুরুষকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া হয়। এতে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়, আর আইনের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। তাহলে পুরুষের মুক্তির পথ কী?
প্রথমত, আইনের সংস্কার জরুরি। নারী সুরক্ষার আইন অবশ্যই থাকবে, কিন্তু তার পাশাপাশি পুরুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। মিথ্যা মামলা, প্রতিশোধমূলক অভিযোগ, সম্পর্কভিত্তিক অপরাধে অস্পষ্টতা—এসব দূর করতে হবে। নারী যেমন নিপীড়নের বিচার চাইতে পারেন, পুরুষও যেন একই অধিকার নিয়ে দাঁড়াতে পারেন—এটাই ন্যায়ের দাবি।
দ্বিতীয়ত, পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে স্বীকৃতি দিতে হবে। একটি সমাজ যতক্ষণ পুরুষের কান্নাকে লজ্জা মনে করবে, ততক্ষণ পুরুষদের ভেতরের ভাঙন কেউ দেখতে পাবে না। পরামর্শকেন্দ্র, কাউন্সেলিং, হেল্পলাইন—এসব ব্যবস্থায় পুরুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। পুরুষকে ‘যন্ত্র’ বা ‘অবিচল দায়িত্ববাহী’ হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। পরিবারে, কর্মস্থলে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে—সব জায়গায় পুরুষের মানসিক মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
পুরুষের মুক্তি মানে নারীর অধিকার কমে যাওয়া নয়—বরং ন্যায়ের পরিধি বিস্তৃত হওয়া। একটি সমাজ তখনই ভারসাম্যপূর্ণ হয়, যখন নারী-পুরুষ দুজনই সমানভাবে মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বিচার পাওয়ার অধিকার ভোগ করেন। সমাজের অগ্রগতি কারো কাঁধে চাপিয়ে সৃষ্টি হয় না—এটা হয় ন্যায়, ভারসাম্য, এবং মানবিকতার ভিত্তিতে।
পুরুষের মুক্তির পথ তাই একটাই—সমমানের অধিকার, সমান বিচার, এবং মানবিকতার স্বীকৃতি। একজন পুরুষও মানুষ—এই সত্য স্বীকার করলেই পরিবর্তন শুরু হবে।