জীবনযাপন ডেস্ক
সংগৃহীত ছবি
চিকিৎসকদের জীবনযাত্রা ব্যস্ততায় ভরা থাকে সব সময়। রোগীর খেয়াল রাখা, দীর্ঘ সময় কাজ করা, মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে সুস্থ থাকতে তাদের প্রতিদিন নিজের খাবারে বাড়তি নজর দিতে হয়। তাই তারা টিফিনে এমন সব খাবার রাখেন, যা শুধু পেটই ভরায় না, বরং হজমশক্তি, ত্বক, মস্তিষ্ক, ইমিউনিটি—সব কিছুকেই দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখে।
সম্প্রতি দুজন চিকিৎসক তাদের টিফিনের খাবারের কথা তুলে ধরেছেন।
সেই খাবারে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানসম্মত বহু উপকার। এই খাবারের তালিকাতেই স্পষ্ট যে কিভাবে সঠিক খাবার খেলে গোটা শরীরে ভারসাম্য বজায় থাকে। চলুন, জেনে নেওয়া যাক কী আছে তাদের খাবার তালিকায়—
সাধারণ মানুষের ধারণা
অনেকে মনে করেন, চিকিৎসকরা হয়তো খুব দামি খাবার খান। কিন্তু, বাস্তবে তারা চটজলদি তৈরি করা সহজপাচ্য, সুষম এবং পেটের জন্য উপকারী—এই চারটি গুণের ভিত্তিতে খাবার বেছে নেন।
যেমন একজন ডার্মাটোলজিস্ট তার টিফিনে রাখেন বেক করা মাছ, বিভিন্ন রঙের সবজি, ব্লুবেরি, দই ও ফ্ল্যাক্সসিড।
বেক করা মাছ শরীরকে দেয় ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিড, যা প্রদাহ কমায়, ব্রেন-ফাংশন বাড়ায় এবং হার্টকে সুস্থ রাখে। বিশেষ করে যাদের দৈনন্দিন চাপ বেশি, তাদের জন্য এই খাবার অনেকটাই ‘অ্যান্টি-স্ট্রেস ফুড’ হিসেবে কাজ করে।
তার সঙ্গে সালাদে থাকা শসা, গাজর ও টমেটো শরীরকে দেয় ফাইবার, মিনারেল, ভিটামিন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট।
এসব জিনিস পেট পরিষ্কার রাখে, হজমশক্তিকে উন্নত করে এবং শরীরের ভেতরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত সালাদ খেলে ত্বক সতেজ থাকে, কারণ ভিটামিন-সি এবং বিটা-ক্যারোটিন ত্বকের কোষ মেরামত করতে সাহায্য করে।
ব্লুবেরিতে আছে উচ্চমাত্রার অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা সেল ড্যামেজ কমাতে এবং ইমিউনিটি শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। ফ্ল্যাক্সসিডে থাকা স্বাস্থ্যকর চর্বি হরমোন ব্যালান্স, মেটাবলিজম ও ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
আরেকজন চিকিৎসক তার টিফিনে রাখেন মাল্টিগ্রেন রুটি, নানা ধরনের বাদাম-কাঠবাদাম ব্রোকলি-গাজর-শসা দেওয়া রঙিন সালাদ।
মাল্টিগ্রেন রুটিতে থাকা ফাইবার শরীরে শক্তি ধরে রাখে এবং রক্তে শর্করার ওঠানামা কমায়। যারা অনেকক্ষণ কাজ করেন, তাদের জন্য এটি দীর্ঘস্থায়ী এনার্জির একটি আদর্শ উৎস।
বাদামে থাকা ভালো চর্বি, ভিটামিন-ই ও প্রোটিন মস্তিষ্কের কাজ, হরমোনের ভারসাম্য এবং ত্বক-চুলকে ভালো রাখতে সাহায্য করে। ব্রোকলিতে আছে ভিটামিন-সি, ফলেট, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা ইমিউনিটিকে শক্তিশালী করে এবং বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের আশঙ্কা কমায়।
এই তালিকায় আরো আছে ক্লাস্টার বিন। আমাদের দেশে খুব পরিচিত এই সবজিতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার, ভিটামিন-বি, ফলেট ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এটি হজমশক্তি বাড়ায়, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। গাভার ফালির পটাশিয়াম রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে এবং রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে। ত্বকের জন্যও এটি উপকারী, কারণ এতে থাকা পুষ্টিগুণ কোষকে সুরক্ষা দেয় এবং বয়সের ছাপ কমাতে সাহায্য করে।
দই এই পুরো খাদ্যতালিকার একটি প্রধান উপাদান। এতে থাকা প্রো-বায়োটিক গাট-ফ্লোরা উন্নত করে, যা হজম, ইমিউনিটি, পুষ্টি শোষণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বর্তমান গবেষণা বলছে, সুস্থ অন্ত্র মানেই শক্তিশালী ইমিউনিটি এবং স্থির মানসিক অবস্থা। তাই চিকিৎসকরা প্রায়ই তাদের টিফিনে দই রাখেন। যাতে খাবার হালকা, পেটের পক্ষে উপকারী এবং সহজপাচ্য হয়।
এতসব খাবারের সমন্বয় শরীরকে শুধু রোগমুক্ত রাখে না, পাশাপাশি বাড়ায় কর্মশক্তি ও মনোযোগ। সঙ্গে, ত্বকের স্বাভাবিক জেল্লা এবং আবেগের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন অল্প করে এমন খাবার খাওয়া অভ্যাস করলে দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ভেতরের ভারসাম্য উন্নত হয়।
সবশেষে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো একটা খাবার শরীরকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে না। কিন্তু, সঠিক খাবারের সমন্বয়, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সচেতন খাদ্যাভ্যাস মিলেই তৈরি করে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। চিকিৎসকরা তাই টিফিনে সবসময় রাখেন এমন খাবার, যা তাদের শক্তি ধরে রাখে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং সারা দিনের মানসিক চাপ সামলাতে সাহায্য করে।
সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস