ধর্ম ডেস্ক
জীবনের চড়াই-উৎরাই উত্তরণের প্রধান সম্বল হলো ধৈর্য ও সহনশীলতা। সংকট মোকাবেলা, লক্ষ্য অর্জন এবং আত্মিক পরিশুদ্ধির ক্ষেত্রে এ দুটি গুণ এক অনন্য হাতিয়ার। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধৈর্য ও সহনশীলতাকে সাফল্য ও শান্তির মূল চাবিকাঠি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিবেদনে ধৈর্য ও সহনশীলতার ধর্মীয়, মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিকগুলো দলিলসহ উপস্থাপন করা হলো।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ: ধৈর্যের আধ্যাত্মিক ভিত্তি ও প্রতিদান
পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ধৈর্যকে মুমিনের ভূষণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা নিজেই সর্বশ্রেষ্ঠ ধৈর্যশীল। হাদিসে এসেছে, ‘কষ্টদায়ক কিছু শোনার পরও ধৈর্য ধারণের ব্যাপারে মহামহিম আল্লাহর চেয়ে অধিক ধৈর্যশীল আর কেউ বা কিছু নাই। মানুষ আল্লাহর সন্তান আছে বলে মিথ্যা দাবি করে, অথচ তিনি তাদের রিজিক দান করেন ও নিরাপত্তা প্রদান করেন।’ (আদাবুল মুফরাদ: ৩৯০) আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৪৬)
ধৈর্যের পরিপূর্ণতা তিনটি স্তরে বিভক্ত: প্রথমত, নফসকে হারাম ও নাজায়েজ কাজ থেকে বিরত রাখা; দ্বিতীয়ত, ইবাদত ও আনুগত্যে স্থির থাকা; এবং তৃতীয়ত, বিপদ-আপদে তাকদিরের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। এর প্রতিদান অপরিসীম। কোরআনে সরাসরি জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে: ‘তোমরা ধৈর্যধারণ করেছ বলে (জান্নাতে) শান্তি তোমাদের উপর।’ (সুরা রাদ: ২৪)। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, মুমিনের ওপর যেকোনো কষ্ট, এমনকি একটি কাঁটাও যতটুকু কষ্ট দেয়, এর বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহ মোচন করেন। (বুখারি: ৫৬৪১)
সহনশীলতার ইসলামি ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ
ধৈর্যেরই একটি সক্রিয় ও বহির্মুখী রূপ হলো সহনশীলতা। ইসলামি পরিভাষায় একে ‘আল-হিলম’ বা প্রজ্ঞাময় সংযম বলা হয়, যা ক্রোধের সময় ধৈর্য ধারণ ও উত্তমভাবে প্রত্যুত্তর দেওয়ার গুণ। এটি কেবল ভিন্ন মত সহ্য করা নয়, বরং শ্রদ্ধা ও সংলাপের মাধ্যমে ঐক্য বিনির্মাণের শিল্প। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তুমি ক্ষমার নীতি অবলম্বন কর, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চল।’ (সুরা আরাফ: ১৯৯)। রাসুলুল্লাহ (স.) ছিলেন ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’, যাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহনশীলতা মানবিক সম্পর্কের ভিত্তি ছিল। সামাজিকভাবে, সহনশীলতা বহুত্ববাদী সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষার অবলম্বন। এটি পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি, কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সামাজিক চুক্তি টিকিয়ে রাখার প্রধান হাতিয়ার।
বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: ধৈর্যের সুস্থতা সৃষ্টিকারী ভূমিকা
আধুনিক মনোবিজ্ঞান ধৈর্যকে মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত বলে প্রমাণ করেছে। ধৈর্যশীল ব্যক্তিরা উদ্বেগ ও হতাশায় কম ভোগেন এবং চাপের পরিস্থিতিতে নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে অধিক সক্ষম (স্নিটকার ও এমোনস, ২০০৭)। হার্ভার্ডের গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, ধৈর্য উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ‘মার্শমেলো পরীক্ষা’ প্রমাণ করে, শিশুকালে যারা ধৈর্য ধরতে পারে, পরবর্তী জীবনে তারা শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক সম্পর্কে অধিক সফল হয়। ধৈর্য দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা ও সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, যা ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে টেকসই সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করা
ঐতিহাসিক ও বাস্তব প্রয়োগ: ধৈর্যের জীবন্ত নমুনা
ইতিহাস ধৈর্যের বিজয়গাথায় সমৃদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবন শুরু থেকেই সংকটের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। শৈশবে পিতৃ-মাতৃহীনতা, নবুয়তের পর নিকটাত্মীয়ের তীব্র বিরোধিতা এবং তায়েফের নির্মম লাঞ্ছনা—সবকিছুতেই তাঁর ধৈর্য ও আল্লাহর উপর অগাধ ভরসা মানবতার জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছে। আধুনিক যুগে নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর কারাবাসে ধৈর্য ও ক্ষমার অস্ত্র দিয়ে একটি জাতির হৃদয় পরিবর্তন করেছেন।
দৈনন্দিন জীবনে ধৈর্যের প্রয়োগ পারিবারিক সম্পর্ক মজবুত করে, সামাজিক সংঘাত প্রশমিত করে এবং কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে। এটি ব্যক্তিকে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত থেকে রক্ষা করে এবং স্থায়ী সমাধানের পথ দেখায়। নবীজি বলেন, ‘যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্যশীলতা দান করেন। ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোনো নেয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি।’ (বুখারি: ১৪৬৯)
সমসাময়িক যুগে ধৈর্যের তাৎপর্য ও অর্জনের কৌশল
ডিজিটাল যুগের তাৎক্ষণিক তৃপ্তির সংস্কৃতি ধৈর্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সামাজিক মাধ্যমের তুলনামূলক হতাশা ও দ্রুত ফলাফলের প্রত্যাশা মানুষকে ধৈর্যহীন করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে ধৈর্য চর্চা একটি সচেতন প্রচেষ্টা। রাসুল (স.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এমন এক সময় আসবে যখন দ্বীনের ওপর ধৈর্য ধারণ করা জ্বলন্ত অঙ্গার হাতে রাখার মতো কঠিন হবে, (তিরমিজি: ২২৬০) কিন্তু তার প্রতিদান হবে অত্যন্ত মহান।
ধৈর্য অর্জনের প্রথম শর্ত হলো তাকদিরের ওপর দৃঢ় ঈমান, যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোনো বিপদ আসে না।’ (সুরা তাগাবুন: ১১) নিয়মিত দোয়া, জিকিরের মাধ্যমে আত্মার প্রশিক্ষণ দিতে হয়। দৈনন্দিন ছোট ছোট পরিস্থিতিতে সংযম পালন এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করে তদানুযায়ী অগ্রসর হওয়া ধৈর্য বৃদ্ধির কার্যকরী পদ্ধতি।
ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ধৈর্য চর্চার প্রায়োগিক উপায়
ধৈর্য ও সহনশীলতার বাস্তব চর্চার কিছু সহজ উপায় দেওয়া হলো:
রাগ বা উত্তেজনার মুহূর্তে তিনবার গভীর শ্বাস নেওয়া এবং প্রতিক্রিয়া দিতে কমপক্ষে দশ সেকেন্ড অপেক্ষা করা।
দৈনিক একটি ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করে (যেমন: একটি অধ্যায় পড়া) তা অবশ্যই সম্পন্ন করা।
পারিবারিক স্তরে
পরিবারের সদস্যদের কথা বিচার বা জবাব দেবার আগে মনোযোগ সহকারে সম্পূর্ণ শোনা।
ছোটখাটো ত্রুটিগুলো উপেক্ষা করে সামগ্রিক সম্পর্কের মূল্যকে প্রাধান্য দেওয়া।
সাপ্তাহিক পরিবারিক বসায় সকলকে নিজের অনুভূতি শেয়ার করার সুযোগ দেওয়া।
সামাজিক স্তরে
ভিন্নমতের মানুষের সাথে শ্রদ্ধাশীল সংলাপে অংশগ্রহণ করা।
কোনো কাজ বা প্রতিক্রিয়ার আগে ‘এটি কি সম্পর্ক স্থাপন করবে নাকি ভাঙবে?’—এই প্রশ্নটি নিজেকে করা।
সামাজিক কর্মকাণ্ডে স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা নেওয়া, যা ধৈর্যের পাশাপাশি সহমর্মিতা বৃদ্ধি করে।
ধৈর্য ও সহনশীলতা কেবল কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা নয়, বরং প্রতিটি পরিস্থিতিকে বুদ্ধিমত্তা ও ঈমান দিয়ে মোকাবেলা করার শিল্প। এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি, আত্মিক শান্তি এবং বাস্তব জীবনের সাফল্যের মধ্যে এক সেতুবন্ধন তৈরি করে। একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য ধৈর্য ও সহনশীলতার চর্চা অপরিহার্য।