মোহাম্মদ জাকির ইসলাম, বিশেষ রিপোর্ট
শীত ঋতু প্রকৃতিতে নিয়ে আসে নান্দনিকতা ও প্রশান্তি, কিন্তু এই মৌসুম আমাদের ত্বকের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। বাতাসে আর্দ্রতা কমে যায়, ত্বকের প্রাকৃতিক তেল শুকিয়ে যেতে থাকে এবং এতে দেখা দেয় শুষ্কতা, চুলকানি, ফাটা ত্বক, এমনকি একজিমার মতো সমস্যাও। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে শীতকালে ধুলাবালি ও শুষ্ক বাতাসের কারণে ত্বকের সংবেদনশীলতা আরও বেড়ে যায়। ত্বকের সুস্থতা ও সৌন্দর্য বজায় রাখতে প্রয়োজন সঠিক যত্ন, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ও নিয়মিত পরিচর্যা। নিচে শীতকালে ত্বক সুন্দর ও সুস্থ রাখার জন্য বিস্তারিত ও কার্যকর নির্দেশনা তুলে ধরা হলো—
১. ত্বকের আর্দ্রতা রক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
শীতকালে ত্বকের আর্দ্রতা দ্রুত হারিয়ে যায়। ফলে ত্বক টানটান অনুভূত হয় এবং রুক্ষ হয়ে ওঠে। এ সময় দিনে কমপক্ষে দুই থেকে তিনবার ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা জরুরি।
মুখের জন্য হালকা, পানি-ভিত্তিক ময়েশ্চারাইজার
শরীরের জন্য ভারী ও তেলসমৃদ্ধ বডি লোশন বা ক্রিম
গোসলের ঠিক পরেই ত্বক সামান্য ভেজা থাকা অবস্থায় ময়েশ্চারাইজার লাগালে তা ভালোভাবে শোষিত হয় এবং ত্বক অনেকক্ষণ নরম থাকে।
২. যথেষ্ট পানি পান করতে হবে
শীতকালে তৃষ্ণা কম অনুভূত হয় বলে অনেকেই পানি কম পান করে থাকেন। কিন্তু শরীরে পানির অভাব হলে ত্বক দ্রুত শুষ্ক ও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। দিনে অন্তত ৮–১০ গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। পাশাপাশি ডাবের পানি, স্যুপ, ফলের রস খেতেও পারেন, যা ত্বককে ভেতর থেকে আর্দ্র রাখে।
৩. গরম পানির ব্যবহার সীমিত করুন
শীতে অনেকেই খুব গরম পানি দিয়ে গোসল করতে পছন্দ করেন, কিন্তু এটি ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত গরম পানি ত্বকের প্রাকৃতিক তেল তুলে নেয়, ফলে ত্বক আরও বেশি শুষ্ক হয়ে যায়। তাই হালকা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভালো।
৪. পুষ্টিকর খাবার ত্বকের সৌন্দর্যের মূল চাবিকাঠি
আপনার ত্বক কেবল বাইরের যত্নে সুন্দর হবে না, ভেতর থেকেও পুষ্টি দরকার।
ত্বকের জন্য উপকারী খাবারগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ ফল (কমলা, লেবু, পেয়ারা)
ভিটামিন ‘ই’ সমৃদ্ধ বাদাম (কাজু, কাঠবাদাম)
বিটা ক্যারোটিনসমৃদ্ধ সবজি (গাজর, মিষ্টি কুমড়া)
পর্যাপ্ত প্রোটিন (ডাল, ডিম, মাছ)
এসব খাবার ত্বককে উজ্জ্বল ও স্বাস্থ্যকর রাখতে সাহায্য করে।
৫. ত্বক পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি
শীতেও ঘাম ও ধুলাবালি জমে ত্বকের রোমকূপ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এজন্য প্রতিদিন সকালে ও রাতে মাইল্ড ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা প্রয়োজন। খুব বেশি সাবান ব্যবহার না করে মৃদু, ত্বকবান্ধব ক্লিনজার ব্যবহার করাই ভালো।
৬. নিয়মিত ত্বক এক্সফোলিয়েশন করুন (সপ্তাহে ১–২ বার)
ত্বকে জমে থাকা মৃত কোষ দূর না হলে ত্বক নিস্তেজ দেখায়। ঘরে তৈরি স্ক্রাব যেমন—চিনি ও মধু, চালের গুঁড়া ও দুধ ব্যবহার করে হালকা করে স্ক্রাব করা যেতে পারে। তবে বেশি ঘষাঘষি করলে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই সতর্ক থাকা জরুরি।
৭. ঠোঁট ও হাত-পায়ের যত্ন নিন
শীতে সবচেয়ে বেশি ফেটে যায় ঠোঁট, হাত ও পায়ের ত্বক। বাইরে যাওয়ার আগে লিপবাম ব্যবহার করুন এবং ঘুমানোর আগে ঠোঁটে সামান্য নারকেল তেল বা ঘি লাগাতে পারেন। হাত-পায়ে নিয়মিত ভ্যাসলিন বা তেল ব্যবহার করলে ফাটা সমস্যা কমে যাবে।
৮. সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সুরক্ষা নিন
শীতকাল হলেও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। বাইরে যাওয়ার আগে SPF ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত। এটি ত্বকে বলি পড়া ও কালচে দাগ পড়া থেকে রক্ষা করে।
৯. মানসিক চাপ কমান ও পর্যাপ্ত ঘুমান
মানসিক চাপ ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে ত্বকে কালচে ছাপ ও ব্রণ দেখা দিতে পারে। প্রতিদিন অন্তত ৭–৮ ঘণ্টা ঘুম এবং মানসিক প্রশান্তি ত্বকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে সহায়ক।
সার্বিকভাবে বলা যায়, শীতে ত্বক সুন্দর রাখতে দরকার নিয়মিত যত্ন, সঠিক খাবার, পর্যাপ্ত পানি পান এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। কোনো কেমিক্যালভিত্তিক পণ্যের উপর নির্ভর না করে প্রাকৃতিক উপায়ে যত্ন নিলেই ত্বক থাকবে উজ্জ্বল, কোমল ও প্রাণবন্ত। এই শীতে তাই নিজের ত্বকের প্রতি একটু বাড়তি যত্ন নিন—সুন্দর থাকুন, সুস্থ থাকুন।