রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
ছবি: প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের চান্দার খাল—এখানে নদীর বুকজুড়ে সারিবদ্ধ ভাসমান নৌকার দৃশ্য যেন ভিন্ন বাস্তবতার নির্মম ছবি। প্রায় ৫০টি জেলে পরিবার বছরের পর বছর ধরে নৌকাকেই ঘর বানিয়ে নিঃশব্দে বেঁচে আছেন। সরু নৌকার ভেতরই তাদের রান্না, ঘুম, সন্তানদের কান্না—সবকিছু। জীবন যেন নদীর স্রোতের মতো—ভাসমান, অনিশ্চিত আর প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ।
জোয়ার-ভাটার সঙ্গে শুধু নদীর পানি নয়—বদলায় তাদের ভাগ্যও। কখনো মাছ পেলে দু’বেলা খাবার জোটে, কখনো খালি হাতে ফিরতে হয়। নদীভাঙন, দুর্যোগ, দারিদ্র্য আর অবহেলা তাদের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।
৭ বছরের মেয়েকে কোলে নিয়ে জেলে নারী সালেহা বেগম বলেন, “সকালে পান্তা খাইছি। রাতে আল্লাহ যদি খাওয়ায় তবেই খাবো। স্বামী-স্ত্রী দুইজনে মাছ ধরি, কিন্তু অনেকদিন মাছ পাই না। কবর দেওয়ার মতো জায়গাও আমাদের নাই।” সালেহার কথায় চান্দার খালে বসবাসকারীদের দীর্ঘ দুঃখগাথার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে।
এদিকে, ঘরহারা মানুষগুলো বাধ্য হয়েই নৌকাকে স্থায়ী ঠিকানা করেছেন। গরমে দমবন্ধ, বৃষ্টিতে পানি, শীতে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা—প্রতিটি ঋতুই নতুন শত্রু।
বয়স্ক জেলে রমিজ উদ্দিন বলেন, “এই নদী আবার মা, আবার শত্রু। মাছ দেয়, আবার ঘরেও নিয়ে যায়। তবুও নৌকা ছাড়া আমাদের আর কিছু নাই।”
নৌকায় বই-খাতা নিয়ে পড়া কঠিন। স্কুলে ভর্তি হলেও যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অধিকাংশ শিশু স্কুলমুখী হয় না। সাধারণ জ্বর, সর্দি, ডায়রিয়া—সবই বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।
জেলে মোহাম্মদ আফান সরদার বলেন, “নদীতেই বাচ্চারা জন্ম নেয়, নদীতেই বড় হয়। সারা বছরই সংগ্রাম, বর্ষা এলে সেই কষ্ট আরও বাড়ে।”
প্রবীণ জেলে আলাউদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “৬৫ বছর নদীতেই আছি। কেউ খোঁজ নেয় না। বৃষ্টিতে ভিজি, রোদে শুকাই—আমরা কি মানুষ না?”
স্থানীয় যুবক সোহেল বলেন, “এটা একদিনের সমস্যা না। প্রজন্ম ধরে তারা অধিকার বঞ্চিত। বাসস্থান, খাদ্য, শিক্ষা—সবকিছুই সংকটে।”
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাশেদ হাসান জানান, “তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। কার্ডবঞ্চিত প্রকৃত জেলেদের দেওয়া হবে জেলে কার্ড। এতে সরকারি সহায়তা, ভিজিডি চাল, প্রশিক্ষণ ও উপকরণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। নদীভাঙন ও বাসস্থানের বিষয়টি দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, “নৌকায় বসবাসকারীদের দুর্দশা আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। যাদের ঘর নেই, তাদের পুনর্বাসন ও নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আনার কাজ চলছে। শিশুদের শিক্ষার জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব দপ্তরকে নিয়ে আমরা একটি স্থায়ী সমাধানের দিকে কাজ করছি।”
এদিকে, চান্দার খালের ৫০টি ভাসমান জীবনের আর্তনাদ আজ প্রশাসনের দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে—এরা শুধু সহানুভূতি নয়, চায় নিশ্চিত অধিকার, নিরাপদ আশ্রয় আর মানবিক জীবন।