মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি
৯ মে ১৯৭১, রবিবার ভোর। আগের দিন ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর মিলাদের তবারক বিতরণ করে নামাজ পড়ে মানুষ গভীর ঘুমে। হঠাৎ গুলির শব্দ আর নারী-পুরুষ-শিশুর আর্তচিৎকার। সকাল ৬টার মধ্যে সোনালি মার্কেট এলাকায় রাস্তার ওপর সারিবদ্ধ করে বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, কৃষক, মুক্তিযোদ্ধাসহ ১১০ জনকে একসঙ্গে গুলি।
যাঁরা গুলিতে মরেননি, তাঁদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
মসজিদে কোরআন পড়তে থাকা মানুষও রেহাই পায়নি। নারীদের ঘর থেকে ধরে এনে গোসাইরচর জামে মসজিদের পাশে বীজিগারে অত্যাচার করা হয়। নারীদের চিৎকার ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের আনাচকানাচে।
গোসাইরচর, নয়নগর, বালুরচর, বাঁশগাঁও জেলেপাড়া, ফুলদী, নাগের চর, কলসেরকান্দি, দড়িকান্দি ও গজারিয়া এ ১০ গ্রামে ঘরে ঘরে খুঁজে যুবকদের বের করে ব্রাশফায়ার করা হয়।
সন্ধ্যা পর্যন্ত খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হয় ৩৬০ জনকে। এমন কোনো বাড়ি ছিল না যেখানে কাউকে হত্যা করা হয়নি। সেদিন কাফনের কাপড়ের অভাবে কলাপাতা আর পুরোনো কাপড় পেঁচিয়ে নিহত স্বজনদের ১০টি গণকবরে দাফন করেছিল গ্রামবাসী।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভবের চরে তল্লাশির নামে এ গ্রামের স্কুলপড়ুয়া এক ছেলেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গণবলাৎকার করে মারে। লেখক-গবেষক শাহদাত পারভেজের ‘গণহত্যা গজারিয়া : রক্ত মৃত্যু মুক্তি’ বইয়ের তথ্য বরাতে জানা যায়, ৩৬০ জনের মধ্যে মাত্র ১৩০ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। বাকিদের লাশ ফুলদী ও মেঘনায় ভেসে গেছে, শকুন আর কাক খেয়েছে।
৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভবের চরে ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। গুলি ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ১১ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
এদের নয়জনই কিশোর। ঘাতকের দল এ কিশোরদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তাদের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। কিশোরদের বিবস্ত্র করে পুরুষাঙ্গ কেটে দেয়। চোখ উপড়ে ফেলে। দেহ থেকে হাত ও আঙুল বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়দের তথ্যসূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা চালায়। এর মধ্যে মুন্সিগঞ্জের কেন্দ্রীয় বধ্যভূমি সরকারি হরগঙ্গা কলেজ ক্যাম্পাসের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ৩৬ জনের লাশ পাওয়া যায়।
সাতানিখিল বধ্যভূমিতে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়। ১৩ মে রাত সাড়ে ৩টায় ঘেরাও করে সদর উপজেলার কেওয়ার চৌধুরীবাড়ি। ওই বাড়ি থেকে ডা. সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহা ও তাঁর দুই ছেলে শিক্ষক সুনীল কুমার সাহা, দ্বিজেন্দ্র লাল সাহা এবং অধ্যাপক সুরেশ ভট্টাচার্য, শিক্ষক দেবপ্রসাদ ভট্টাচার্য, পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর শচীন্দ্রনাথ মুখার্জিসহ ১৭ জন বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে যায়। ১৪ মে সকাল ১০টায় কেওয়ার সাতানিখিল গ্রামের খালের পারে নিয়ে চোখ বেঁধে ১৬ জনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে ফেলে যায়। আর ডা. সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহাকে ধরে নিয়ে যায় হরগঙ্গা কলেজের সেনাক্যাম্পে। সেখান থেকে আর তিনি ফিরে আসেননি। টঙ্গীবাড়ী উপজেলার পালবাড়ী বধ্যভূমি আবদুল্লাহপুরের বাড়িটিতে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক বৃষ্টিভেজা দিনে আক্রমণ চালিয়ে এ বাড়ির মালিক, অশ্রিতসহ ১৯ জনকে হত্যা করে।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রবের ছেলে কাজী বিপ্লব হাসান বলেন, ‘জেলার বেশির ভাগ বধ্যভূমি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। এসব বধ্যভূমি এখন মাদকসেবীদের আড্ডাস্থল। ’