ধর্ম ডেস্ক
আলেমদের জন্য ৬টি বড় সতর্কবার্তা
ইসলামে ‘ইলম’ বা দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা একটি শ্রেষ্ঠ ইবাদত। কোরআন ও সুন্নাহতে আলেমদের ‘নবীদের উত্তরাধিকারী’ হিসেবে উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তবে এই সুউচ্চ মর্যাদার সমান্তরালে রয়েছে কঠিন দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার ভয়। জ্ঞান যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে অন্য কোনো জাগতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তবে তা কেয়ামতের দিন শাস্তির কারণ হতে পারে। আলেমদের এই বিচ্যুতি ও এর দালিলিক সতর্কবার্তা নিয়ে আজকের আলোচনা।
১. লৌকিকতা ও প্রসিদ্ধির মোহ (রিয়া)
আলেমদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো ‘ইখলাস’ বা নিয়তের বিশুদ্ধতা। জ্ঞান অর্জন বা প্রচারের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির বদলে যদি মানুষের প্রশংসা ও খ্যাতি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে সেই জ্ঞানই ধ্বংসের কারণ হয়। হাদিস অনুযায়ী, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে তিন ব্যক্তিকে দিয়ে জাহান্নামের আগুন প্রজ্বলিত করা হবে, তাদের একজন হলেন সেই আলেম যিনি মানুষকে দেখানোর জন্য ইলম অর্জন করেছিলেন। আল্লাহ তাকে বলবেন, ‘দুনিয়াতে তুমি তোমার প্রত্যাশিত প্রশংসা পেয়ে গেছ।’ এরপর তাকে উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহিহ মুসলিম: ১৯০৫)
২. কথা ও কাজের অমিল (আচরণিক দ্বিমুখীতা)
অন্যকে নসিহত করা অথচ নিজের জীবনে তা পালন না করা ইসলামে কঠোরভাবে নিন্দিত। আলেমের কথা ও কাজের অমিল সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বীনের প্রতি অনীহা তৈরি করে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, যার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে এবং সে যাঁতাকলের গাধার মতো ঘুরতে থাকবে। জাহান্নামিরা তাকে জিজ্ঞেস করবে, আপনি কি আমাদের ভালো কাজের আদেশ দিতেন না? সে বলবে, দিতাম ঠিকই, কিন্তু নিজে তা করতাম না। (সহিহ বুখারি: ৩২৬৭)
৩. জাগতিক স্বার্থে দ্বীনি জ্ঞানের ব্যবহার
দ্বীনী জ্ঞানকে অর্থ, পদমর্যাদা বা সামাজিক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার বানানো আলেমদের পরকালীন দেউলিয়াত্বের দিকে নিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি এমন জ্ঞান অর্জন করল যার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার কথা, কিন্তু সে তা কেবল দুনিয়াবী স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে করল, সে কেয়ামতের দিন জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। (সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৬৪)
৪. অহংকার ও মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা
ইলম মানুষকে বিনয়ী করে, কিন্তু সেই ইলম যদি আলেমের মধ্যে আভিজাত্য বা শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভ তৈরি করে, তবে তা হবে তার পতনের কারণ।আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লুকমান: ১৮)। হাদিসে এসেছে, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম: ৯১)
৫. সত্য গোপন করা ও বিভ্রান্তিকর ফতোয়া
পার্থিব ভয়, রাজনৈতিক চাপ বা কারো মন রক্ষার্থে সঠিক ফতোয়া না দেওয়া অথবা জেনেবুঝে সত্য গোপন করা বড় অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আমার নাজিল করা সুস্পষ্ট নিদর্শন ও হেদায়েত গোপন করে… তাদের ওপর আল্লাহ লানত করেন।’ (সুরা বাকারা: ১৫৯) রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যাকে কোনো জ্ঞান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো আর সে তা গোপন করল, কেয়ামতের দিন তার মুখে আগুনের লাগাম পরানো হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৫৮)
৬. বিতর্ক ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য জ্ঞান অর্জন
অন্য আলেমদের তর্কে পরাজিত করা, সাধারণ মানুষের ওপর পাণ্ডিত্য জাহির করা বা মানুষের দৃষ্টি নিজের দিকে আকর্ষণের উদ্দেশ্যে যারা ইলম শেখে, তাদের জন্য কঠোর হুশিয়ারি রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যাক্তি নির্বোধের সাথে ঝগড়া করার জন্য অথবা আলেমদের ওপর বাহাদুরি প্রকাশের জন্য অথবা জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য জ্ঞানার্জন করে, সে জাহান্নামি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৫৩)
নিয়তই নির্ধারণ করবে পরিণাম
পরিশেষে বলা যায়, ইলম আলেমদের জন্য যেমন আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ, তেমনি ইখলাস ও আমল না থাকলে তা কঠিন পরীক্ষার কারণ। আলেমের প্রকৃত সৌন্দর্য হলো বিনয়, তাকওয়া এবং কথা ও কাজের সামঞ্জস্য। ইলম যেন আমাদের অহংকারের পথে না নিয়ে জান্নাতের পথে নিয়ে যায়, সেই প্রার্থনা আমাদের সবার।
মহান আল্লাহ সকল আলেম ও জ্ঞানপিপাসুকে আত্মপ্রবঞ্চনা ও বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।