মো: আলাউদ্দিন মতামত।
গত ৫৪ বছরে ভালোমন্দে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর দেশ এখন জোরকদমে ত্রয়োদশ নির্বাচনের পথে। এতে ২ হাজার ৫৮৫ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। ১ হাজার ৯৬৭ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত হয়েছে। প্রার্র্থিতা প্রত্যাহারের পর গতকাল প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে। আজ থেকে প্রতীক নিয়ে প্রার্থীরা প্রচারে নামবেন। বাকি আর মাত্র ২০ দিন। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। সরকার ও নির্বাচন কমিশন ইতঃপূর্বে ঘোষণা করেছে ইতিহাসসেরা, একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন হবে। পাশাপাশি ফ্যাসিস্ট যাতে আর ফিরতে না পারে, জনগণের ভোটাধিকার যাতে আর কেউ ছিনতাই করতে না পারে সেজন্য একই দিনে হচ্ছে গণভোট। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রায় সব দলই পক্ষপাতদুষ্টের অভিযোগ করেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশটা উদার নাকি উগ্রপন্থি ও রাষ্ট্রবিরোধী শক্তির দখলে চলে যাবে-সেই পরীক্ষা হবে নির্বাচনে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০০৮-এর মতো ভারসাম্যহীন নির্বাচন মেনে নেওয়া হবে না। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ২০০৮-এর মতো নয়, ১৯৯১ সালের মতো নির্বাচন দেখতে চায়। অতীতের সব নির্বাচনই কোনো না কোনো মডেলে হয়েছে। দেখার বিষয় হলো অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এবারের নির্বাচন কোন মডেলে হয়। পুরোনো কোনো মডেলের অনুকরণ, নাকি নতুন কোনো মডেল।
অতীতের নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ, বুধবার অনুুষ্ঠিত দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪টি দলের ১ হাজার ৯১ প্রার্থী অংশ নিয়েছিলেন। ভোটার ছিল ৩ কোটি ৫২ লাখ ৫ হাজার ৬৪২ জন। প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৮৮ লাখ ৫১ হাজার ৮০৮। প্রদত্ত ভোটের শতকরা হার ছিল ৫৩ দশমিক ৫৪। ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২৯২টি আসন। এর মধ্যে ১১ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই সময় গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) পেয়েছিল ৩টি আসন। ন্যাপ (ভাসানী) ১টি, বাংলাদেশ জাতীয় লীগ ১টি আসন এবং স্বতন্ত্র তিনজন নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর ছয় মাস ২৯ দিন। দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, বুধবার। ২৯টি দল অংশ নেয়। প্রার্থী ছিলেন ২ হাজার ১২৫ জন। ভোটার ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৮৫৮ জন। প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৬ হাজার ১২৪। যার শতকরা হার ছিল ৫১ দশমিক ২৮। ওই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পেয়েছিল ২২০ আসন। এ ছাড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৩৯, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ১২, জাসদ ৮, ইসলামী ডেমোক্রেটিক লীগ ৬, আওয়ামী লীগ (মিজান) ২, জাতীয় লীগ ২, গণফ্রন্ট ২, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আন্দোলন ১, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল ১, জাতীয় একতা পার্টি ১ এবং ন্যাপ (মোজাফফর) ১টি আসন লাভ করে। স্বতন্ত্র নির্বাচিত হন পাঁচজন। ওই সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর ১১ মাস ২২ দিন। তৃতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৮৬ সালের ৭ মে, বুধবার। ২৯টি দল এতে অংশ নেয়। প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৫২৭ জন। ভোটার ৪ কোটি ৭৩ লাখ ২৫ হাজার ৮৮৫ জন। প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৮১ লাখ ৩ হাজার ৮৮৯। প্রদত্ত ভোটের শতকরা হার ছিল ৮৯ দশমিক ৩৮। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পেয়েছিল ১৫৩ আসন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ৭৬, জামায়াতে ইসলামী কোন মডেলে হবে ছাব্বিশের নির্বাচন১০, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ৬, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ৫, মুসলিম লীগ ৪, জাসদ (রব) ৪, ওয়ার্কার্স পার্টি (নজরুল) ৩, জাসদ (সিরাজ) ৩, ন্যাপ (মোজাফফর) ২ আসন এবং চারজন স্বতন্ত্র নির্বাচিত হন। এই সংসদের মেয়াদ ছিল ৭৫ দিন। চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ। এ নির্বাচনে আটটি দল অংশ নেয়। প্রার্থী ছিলেন ৯৭৭ জন। ভোটার ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৬৩ হাজার ৮২৯ জন। প্রদত্ত ভোটের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৮৮ লাখ ৭৩ হাজার ৫৪০। যার শতকরা হার ছিল ৫৪ দশমিক ৯৩। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পেয়েছিল ২৫১ আসন। এ ছাড়া সম্মিলিত বিরোধী দল ১৯, জাসদ (সিরাজ) ৩, ফ্রীডম পার্টি ২ আসন এবং ২৫ জন স্বতন্ত্র নির্বাচিত হন। এই সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর সাত মাস ১১ দিন। পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, বুধবার। ৭৫টি দল এতে অংশ নেয়। প্রার্থী ছিলেন ২ হাজার ৭৮৭ জন। ভোটার সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ২০ লাখ ৮১ হাজার ৭৯৩। প্রদত্ত ভোটের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৪৪ লাখ ৭৭ হাজার ৮০৩। প্রদত্ত ভোটের শতকরা হার ছিল ৫৫ দশমিক ৫৪। এ নির্বাচনে বিএনপি পায় ১৪০ আসন। অন্যেিদক আওয়ামী লীগ ৮৮, জাতীয় পার্টি ৩৫, সিপিবি ৫, বাকশাল ৫, ন্যাপ (মোজাফফর) ১, গণতান্ত্রিক পার্টি ১, জামায়াতে ইসলামী ১৮, ইসলামী ঐক্য জোট ১, ওয়ার্কার্স পার্টি ১, জাসদ (সিরাজ) ১, এনডিপি ১ আসন এবং তিনজন স্বতন্ত্র নির্বাচিত হন। এই সংসদের মেয়াদ ছিল চার বছর আট মাস। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, বুধবার। নির্বাচনে ৪২টি দল অংশ নেয়। প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৪৫০ জন। ভোটার ৫ কোটি ৬৭ লাখ ২ হাজার ৪১২ জন। প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৭ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮১। শতকরা হার ছিল ২৬ দশমিক ৭৪। এই নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছিল ২৭৮ আসন। এর মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন ৪৯ জন। ফ্রীডম পার্টি ১ আসন এবং ১০ জন স্বতন্ত্র নির্বাচিত হন। এই সংসদের মেয়াদ ছিল ১১ দিন। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালের ১২ জুন, বুধবার। ৮১টি দল এ নির্বাচনে অংশ নেয়। ভোটার ছিল ৫ কোটি ৬৭ লাখ ২ হাজার ৪২২ জন। প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ৪ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ৫৬৪। শতকরা হার ছিল ৭৫ দশমিক ৬০। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬ এবং বিএনপি ১১৬ আসনে জয়ী হয়। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ৩২, জামায়াতে ইসলামী ৩, ইসলামী ঐক্য জোট ১, জাসদ (রব) ১ আসন এবং একজন স্বতন্ত্র নির্বাচিত হন। এই সংসদ পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করে। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ২০০১ সালের ১ অক্টোবর, সোমবার। নির্বাচনে ৫৫টি দল অংশ নেয়। প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৯৩৯ জন। ভোটার ছিল ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪৬ হাজার ৩৬৮ জন। প্রদত্ত ভোট ছিল ৫ কোটি ৬১ লাখ ৮৫ হাজার ৭০৭। শতকরা হার ছিল ৭৪ দশমিক ৭৩। এই নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩ আসন লাভ করে। আওয়ামী লীগ ৬২, জামায়াতে ইসলামী ১৭, জাতীয় পার্টি (না-ফি) ৪, ইসলামী ঐক্যজোট ২, জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্য ফ্রন্ট ১৪ , জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) ১, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ১টি আসন পায়। ছয়জন স্বতন্ত্র নির্বাচিত হন। এই সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ হয়। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর, বুধবার। নির্বাচনে ৩৮টি দল অংশ নেয়। প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৫৬৭ জন। ভোটার সংখ্যা ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৩। প্রদত্ত ভোট ৭ কোটি ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৪৮৫। প্রদত্ত ভোটের শতকরা হার ছিল ৮৭ দশমিক ১৩। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০ আসন লাভ করে। বিএনপি ৩০, জাতীয় পার্টি (জাপা) ২৭, জাসদ ৩, ওয়ার্কার্স পার্টি ২, জামায়াতে ইসলামী ২, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ১, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ১টি আসন পায়। চারজন স্বতন্ত্র নির্বাচিত হন। এই সংসদও পাঁচ বছর পূর্ণ করে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি, রবিবার। নির্বাচনে ১২টি দল অংশ নেয়। দেশের ইতিহাসে এই নির্বাচন ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত। মোট প্রার্থীর মধ্যে ৫৪৩ জন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন এবং ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। পরে ১৪৭ আসনে ৩৯০ জন নির্বাচন করেন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩৪, জাতীয় পার্টি (জাপা) ৩৪, জাসদ ৫, ওয়ার্কার্স পার্টি ৬, জাতীয় পার্টি (জেপি) ২, তরিকত ফেডারেশন ২, বিএনএফ ১টি আসনে জয়ী হয়। স্বতন্ত্র নির্বাচন করে ১৬ জন জয়ী হন। এই সংসদের মেয়াদও পাঁচ বছর পূর্ণ হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর, রবিবার। ৩৮টি দল এতে অংশ নেয়। প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৮৪৮ জন। ভোটার ছিল ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ জন। প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৩১ লাখ ৫১ হাজার ২১৭। যার শতকরা হার ছিল ৮০ দশমিক ৪১। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৫৭, বিএনপি ৬, জাতীয় পার্টি (জাপা) ২২, জাসদ ২, ওয়ার্কার্স পার্টি ৩, জাতীয় পার্টি (জেপি) ১, বিকল্পধারা ২, তরিকত ফেডারেশন ১, গণফোরাম ২টি আসন পায়। তিনজন স্বতন্ত্র নির্বাচিত হন। এই সংসদও মেয়াদ পূর্ণ করে। (তথ্যসূত্র : অ্যাডভোকেট এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার সম্পাদিত ‘আইন বিধিমালা তথ্য ও ফলাফল, বাংলাদেশ নির্বাচন।) দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি, রবিবার। ওই বছরের ৫ আগস্ট গণ অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন এই সরকারের পতন ঘটে।
বিগত ১২টি নির্বাচন নিয়ে নানা নাটকীয়তা হয়েছে। এর মধ্যে দিনের ভোট রাতে হয়েছে। ভোটের আগেই রাজনৈতিক দলের নেতা জেনে গিয়েছেন তার দলকে কত আসন দেওয়া হবে। এর মধ্যে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। ওই নির্বাচনে সরকার গঠনের জন্য আওয়ামী লীগের পূর্বপ্রস্তুতি ছিল। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা নিশ্চিত মন্ত্রী হওয়ার আশা নিয়ে মুজিবকোট বানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল হোয়াইট কলারের জালিয়াতির নির্বাচন। বাহ্যিকভাবে এই নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও ভিতরে ছিল বড় ধরনের ষড়যন্ত্র। নির্বাচন হওয়ার আগেই বেগম খালেদা জিয়া জানতে পেরেছিলেন তার দলকে ৩০ আসন দেওয়া হবে। অর্থাৎ ওই নির্বাচনের আগেই কোন দলকে কত আসন দেওয়া হবে তা ঠিক করে রাখা হয়েছিল। তারপর নির্বাচন হয়েছিল। ঘটনাটি এত সূক্ষ্মভাবে হয়েছিল যে পূর্বাহ্ণে কেউ বুঝতেই পারেনি। সে কারণেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোন মডেলে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে এটা নিশ্চিত যে নির্বাচনের আগে যদি আসন নির্ধারণ হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কারওই সেফ এক্সিট হবে না। ফলে সাধু সাবধান!