সংবাদ এই সময়।
ছবি : সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতির ফলে মানুষের চিন্তাশক্তি ও যন্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতির ফলে মানুষের চিন্তাশক্তি ও যন্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দাবা খেলার গ্র্যান্ডমাস্টারকে হারানো, রোগ নির্ণয়, ছবি ও লেখা তৈরিসহ নানা ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখালেও মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য এখনো স্পষ্ট।
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলো বলছে, অটোমেশনের এ যুগেও মানুষের চিন্তাশক্তি ও বিচারবুদ্ধি অনন্য ও অপরিহার্য। মৌলিক এ পার্থক্যগুলো বোঝার মাধ্যমে কেবল মানুষ ও যন্ত্রের ব্যবধানই স্পষ্ট হয় না, বরং এটি প্রমাণ করে প্রযুক্তি কখনই মানুষের স্থলাভিষিক্ত হতে পারবে না।
মৌলিক ব্যবধান
বিবর্তন, অভিজ্ঞতা ও চেতনার সমন্বয়ে গঠিত বিলিয়ন বিলিয়ন নিউরনের জটিল সংকেতের মধ্য দিয়ে বিকাশ হয় মানুষের বুদ্ধিমত্তা। অন্যদিকে এআই কেবল গাণিতিক অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কাজ করে, যা তথ্যের ধরন খুঁজে বের করে। মানুষ খুব সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারে, যা ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা সম্ভব।
যেমন একটি শিশু একবার গরম চুলার স্পর্শ থেকে তাপের ভয় বুঝতে পারলে সে আয়রন বা আগুনের যেকোনো উৎস সম্পর্কে সতর্ক হয়ে যায়। কিন্তু এআইকে কোনো কিছু শেখাতে লাখ লাখ ডাটার প্রয়োজন হয়। এছাড়া এটি এক বিষয়ের শিক্ষা অন্য ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারে না। মানুষের বুদ্ধিমত্তা জৈবিক হওয়ায় মানুষ ক্লান্তি বা ক্ষুধার মতো শারীরিক অনুভূতি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা যন্ত্রের পক্ষে অসম্ভব।
সৃজনশীলতা ও অ্যালগরিদমের সীমাবদ্ধতা
মানুষ ও এআইয়ের মধ্যে সৃজনশীলতা একটি বড় বিভাজন রেখা। মেশিন বিদ্যমান উপাদানকে নতুনভাবে সাজাতে পারলেও প্রকৃত উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় আবেগীয় ও সাংস্কৃতিক জ্ঞান তার নেই। এআইয়ের তৈরি করা শিল্প বা লেখা তার ট্রেনিং ডাটার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকে।
যন্ত্রের কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা বা দুঃখ-সুখ প্রকাশের তাড়না নেই, যা মানুষের উদ্ভাবনের মূল উৎস। বিজ্ঞানীরা ‘কী হতো যদি’ প্রশ্ন তুলে নতুন তত্ত্ব দেন কিংবা শিল্পীরা তাদের ব্যক্তিগত অনুভূতি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন। এসব ক্ষেত্রে এমন এক মানবিক ছোঁয়া থাকে, যা কোনো অ্যালগরিদম নকল করতে পারে না।
ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বা আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা
আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব অনস্বীকার্য। মেশিন হয়তো মানুষের মুখের হাসি বা কণ্ঠের বিষণ্ণতা শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু সে নিজে তা অনুভব করে না। মানুষের সহানুভূতি তাকে অন্যের কষ্ট বুঝতে ও সে অনুযায়ী সাড়া দিতে সাহায্য করে। একজন শিক্ষকের যে অনুপ্রেরণা দেয়ার ক্ষমতা থাকে, তা কেবল তথ্যের ওপর নির্ভর করে না। এআই প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে আবেগের নকল করতে পারলেও এটি কাউকে উৎসাহিত করার আনন্দ বা কারো হাসির তৃপ্তি বোঝে না।
প্রোগ্রামিংয়ের বাইরের নৈতিক সিদ্ধান্ত ও দায়বদ্ধতা
নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা এথিক্যাল ডিসিশন মেকিংয়ের ক্ষেত্রে মানুষ ও যন্ত্রের সক্ষমতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষ কেবল নিয়ম অনুসরণ করে না, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী তার নৈতিক কাঠামোর বিবর্তন ঘটায়। ট্রলি প্রবলেমের মতো জটিল ক্ষেত্রে, যেখানে একজনকে বাঁচাতে অন্যজনকে উৎসর্গ করার প্রশ্ন আসে, সেখানে যন্ত্র কেবল হিসাব কষতে পারে। কিন্তু মানুষ তার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তিগত মূল্যবোধ দিয়ে ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করে। মানুষ তার সিদ্ধান্তের ভার বা নৈতিক দায়িত্ব অনুভব করতে পারে, যা কোনো যান্ত্রিক নির্দেশনার পক্ষে সম্ভব নয়।
সুনির্দিষ্ট নিয়ম ছাড়াই খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা
মানুষ সম্পূর্ণ নতুন ও নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে। কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম ছাড়াই মানুষ তার পূর্বের বিচিত্র অভিজ্ঞতার আলোকে তাৎক্ষণিক সমাধান বের করতে সক্ষম।
যেমন একজন বাবুর্চি খাবারের সাজসজ্জায় চিত্রকলার কৌশল ব্যবহার করতে পারেন। অন্যদিকে এআই সিস্টেমগুলো নির্দিষ্ট একটি কাজে অত্যন্ত দক্ষ হলেও ভিন্ন কোনো কাজে তাল মেলাতে হিমশিম খায়।
মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে গভীর পার্থক্য হলো চেতনা। মানুষ কেবল তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে না, সে তা অনুভব করে। একটি এআই সিস্টেম সূর্যাস্তের ছবি বিশ্লেষণ করতে পারলেও তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে না। এখানেই এআইয়ের সঙ্গে মানুষের মূল পার্থক্য।