মুফতি উমর ফারুক আশিকী
ছবি: সংগৃহীত
দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। মানব সমাজের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে ন্যায়বিচারের গুরুত্ব অপরিসীম। শুধু সামাজিক প্রেক্ষাপটেই নয়, এটি আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্বও বটে। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাদের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।
কোরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা
পবিত্র মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও নিকট আত্মীয়দের দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। (সুরা নাহাল, ৯০)
এই আয়াতে আল্লাহতায়ালা যেসব বিষয়ে আদেশ করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো: ১. ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করা এবং ২. সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা।
ইনসাফের মর্মার্থ: ঘরে-বাইরে, আপন-পর সকলের ব্যাপারে সুবিচার করা অপরিহার্য। কারো সাথে শত্রুতা, ঝগড়া, ভালোবাসা বা আত্মীয়তার সম্পর্ক যেন সুবিচারের পথকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে না পারে।
মধ্যমপন্থা অবলম্বন: এর আরেকটি তাৎপর্য হলো—মধ্যমপন্থা (ইতিকদাল) অবলম্বন করা এবং কোনো বিষয়ে বাড়াবাড়ি না করা। কারণ, দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি বা সীমা অতিক্রম করা যেমন নিন্দনীয়, তেমনি এর বিপরীত অলসতা বা ছাড়াছাড়িও অপছন্দনীয়।
ন্যায় প্রতিষ্ঠায় নবীজির আপোসহীনতা
নবি করিম (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক ছিলেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও এই বিষয়ে অনুপ্রাণিত করতেন। সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টার প্রতি তিনি উদ্বুদ্ধ করতেন।
১. জালিমের সামনে সত্য কথা
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, স্বৈরাচারী শাসকের সামনে ন্যায়সঙ্গত কথা বলাও উত্তম জিহাদ। (আবু দাউদ, ৪৩৪৪)। এটি প্রমাণ করে, ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নীরব না থেকে সোচ্চার হওয়া ঈমানদারদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
২. নিজের প্রিয়জনের ক্ষেত্রেও কঠোরতা
নবিজি (সা.) ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কখনো আপোস করেননি। তিনি তাঁর নিকটতম মানুষের ক্ষেত্রেও প্রভাবিত হতেন না। বিখ্যাত ঘটনাটি হলো— মাখযুমী গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত মহিলা চুরি করলে কুরাইশরা চিন্তিত হয়ে পড়ে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয়জন উসামাহ (রা.)-কে সুপারিশের জন্য পাঠায়। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি আল্লাহর শাস্তির বিধানের ব্যাপারে সুপারিশ করছ? এরপর তিনি দাঁড়িয়ে খুতবা দিলেন এবং বললেন, হে মানবমন্ডলী! নিশ্চয়ই তোমাদের আগের লোকেরা গোমরাহ হয়ে গিয়েছে। কারণ, কোনো সম্মানী ব্যক্তি যখন চুরি করত তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত তখন তার উপর শরীয়াতের শাস্তি কায়েম করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (সা.)-এর কন্যা ফাতেমাও যদি চুরি করে তবে অবশ্যই মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর হাত কেটে দেবে। (বুখারি, ৬৭৮৮)। এই হাদিসটিতে স্পষ্ট শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে ইনসাফের প্রশ্নে ধনী-গরিব, প্রভাবশালী-দুর্বল সবাই সমান।
ন্যায়বিচার ইবাদত ও পরকালীন মুক্তি
ইসলামে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কেবল একটি সামাজিক দায়িত্বই নয়, এটিকে ইবাদতের সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে। এটি এমন নেক আমল, যাতে সদকার সওয়াব পাওয়া যায়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষের প্রত্যেক জোড়ার প্রতি সদকা রয়েছে, প্রতি দিন যাতে সূর্য উদিত হয় দু’জন লোকের মাঝে সুবিচার করাও সদকা…।(বুখারি, ২৯৮৯)
অন্যদিকে, পরকালে ন্যায়পরায়ণ শাসককে জান্নাত দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইবনে বুরাইদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, বিচারক তিন প্রকার। এক প্রকার বিচারক জান্নাতি এবং অপর দুই প্রকার বিচারক জাহান্নামী। জান্নাতি বিচারক হলো, যে সত্যকে বুঝে তদনুযায়ী ফায়সালা দেয়। (আবু দাউদ, ৩৫৭৩)
শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই নয়, মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে— পরিবারে, কর্মস্থলে, সমাজে— ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের কর্তব্য। নিজের সন্তান-সন্ততি, অধিনস্ত ও সহকর্মীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব।
চলমান অস্থিরতা ও সংঘাতময় বিশ্বে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে, আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে পক্ষপাতমুক্ত হয়ে ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা। কারণ, ন্যায়ের আলো ছাড়া সমাজ কখনোই আলোকিত হতে পারে না।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক