জীবনযাপন ডেস্ক
সংগৃহীত ছবি
ক্লান্তি, ঘুম বা বোরিং লাগলে মানুষের সাধারণত হাই উঠে থাকে—এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু যখন দিনভর অস্বাভাবিকভাবে বারবার হাই ওঠা শুরু হয়, তখন বিষয়টি কেবল সাধারণ ক্লান্তির লক্ষণ না-ও হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় প্রচণ্ড হাই ওঠা। অর্থাৎ খুব ঘন ঘন, অকারণে বা অস্বাভাবিকভাবে হাই ওঠা।
অনেক সময় এটি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, মানসিক চাপ, মস্তিষ্কের সতর্কতা বজায় রাখা, কিংবা কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার প্রাথমিক সংকেত হতে পারে।
হাই তোলার কারণ কী
হাই তোলার পেছনে প্রথম বড় কারণ হলো অতিরিক্ত ক্লান্তি বা মানসিক অবসাদ। দীর্ঘদিন ধরে নিরবচ্ছিন্ন কাজ, অতিরিক্ত চাপ, রাতে ঘুম কম হওয়া, অথবা অফিস-বাড়ির ব্যস্ততার কারণে মানসিক শক্তি কমতে থাকে। মাথা ভারী লাগে, মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায় এবং শরীর সতর্ক থাকতে হাই তোলা শুরু করে।
মস্তিষ্ক যখন সতর্কতা হারাতে থাকে, তখন হাই তোলা তাকে পুনরায় ‘রিফ্রেশ’ করার কাজ করে।
মানসিক চাপ
দ্বিতীয় বড় কারণ হলো, উচ্চ মানসিক চাপ বা উদ্বেগ। অনেকে জানেন না, স্ট্রেস বাড়লে শরীরে অস্বাভাবিকভাবে হাই ওঠা খুব সাধারণ একটি ঘটনা। উদ্বেগ শরীরের অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেমকে প্রভাবিত করে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সামান্য পরিবর্তন ঘটায়, যা শরীরকে বেশি হাই তুলতে বাধ্য করে।
এ ছাড়া স্ট্রেস বা প্যানিক অ্যাটাকের সময় শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে উঠতে পারে। তখন হাই তোলার মাধ্যমে শরীর তাপমাত্রা কমাতে চেষ্টা করে।
ঘুমের অভাব
ঘুমের অভাবও বারবার হাই তোলার অন্যতম বড় কারণ। পর্যাপ্ত ‘ডিপ স্লিপ’ না হলে মস্তিষ্ক পরদিন ঠিকমতো সতর্ক থাকতে পারে না। ফলে মাথা ঝিমঝিম করে, মনোযোগ কমে যায় এবং হাই তোলার মাধ্যমে শরীর পুনরায় জেগে থাকার চেষ্টা করে।
হাই তোলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
অনেকের ক্ষেত্রে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, এসএসআরআই, অ্যান্টিহিস্টামিন বা পেইনকিলার খাওয়ার পর অতিরিক্ত হাই ওঠা লক্ষ করা যায়। এসব ওষুধ মস্তিষ্কের স্নায়ু-সংকেতের রাসায়নিক ভারসাম্য পরিবর্তন করে, যা হাই তোলার হার বাড়িয়ে দেয়।
ভ্যাগাস নার্ভজনিত সমস্যা
অনেক সময় ভ্যাগাস নার্ভজনিত প্রতিক্রিয়া নামে একটি শারীরিক প্রতিক্রিয়ার কারণেও হাই ওঠে। যখন হঠাৎ মাথা ঘোরে, বমি ভাব, দুর্বলতা বা অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন শরীর রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দন কমিয়ে ফেলে। এই সময় হাই তোলা শরীরের জন্য একটি প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া। এটি সাধারণত অসুস্থতা, রক্তশূন্যতা, জলাভাব বা অতিরিক্ত গরমের কারণে হয়।
স্বাস্থ্য সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কিছু কিছু গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবেও অতিরিক্ত হাই ওঠা লক্ষ করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, স্লিপ অ্যাপনিয়া, হৃদরোগ, নিউরোলজিক্যাল সমস্যা, মস্তিষ্কের স্নায়ুজনিত অস্বাভাবিকতা, এমনকি ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম—এসব অবস্থাতেও বারবার হাই তোলা একটি সাধারণ উপসর্গ হয়ে উঠতে পারে। এসব ক্ষেত্রে হাইয়ের সঙ্গে মাথা ব্যথা, অবসাদ, মনোযোগের সমস্যা বা হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিকতা উপসর্গ হিসেবে থাকতে পারে।
বারবার হাই তোলা
যারা সারা দিন বারবার হাই তোলেন, তাদের জন্য কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করাও সহায়ক হতে পারে। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম, ক্যাফেইন কমানো, পানি বেশি খাওয়া, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এবং মাঝে মাঝে বিরতি নেওয়া শরীরকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে সাহায্য করে।
তবে যদি হাই তোলার সঙ্গে মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দেয়, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বড় সমস্যার ইঙ্গিত
বারবার হাই তোলা সাধারণ একটি প্রতিক্রিয়া হলেও যখন এটি নিত্যদিনের জীবনে অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে, তখন এটি শরীরের ভেতরে বড় কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই নিজের শরীরের সংকেতগুলো বোঝা খুব জরুরি।
সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস