মাওলানা হাবিবুর রহমান রেদওয়ান
জিন সম্পর্কে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি
আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে মানুষ ছাড়াও আরো বহু প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো জিন, যা মানুষের চোখে না দেখা গেলেও তা মহান আল্লাহর এক অদৃশ্য সৃষ্টি, যাদের অস্তিত্ব কোরআন ও সহিহ হাদিসে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর জিন ও মানুষকে শুধু এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদত করবে।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৫৬)
জিন সম্পর্কে সমাজে বহু কুসংস্কার, অতিরঞ্জন ও ভুল ধারণা প্রচলিত থাকলেও ইসলাম এ বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, দলিলভিত্তিক ধারণা প্রদান করেছে।
এই প্রবন্ধে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে জিনের প্রকৃতি, শ্রেণিবিভাগ, আচরণ এবং রূপান্তরক্ষমতা আলোচনা করা হবে।
জিন আল্লাহর সৃষ্টি এবং তারা বিভিন্ন শ্রেণির হয় : জিন কোনো কাল্পনিক সত্তা নয়, বরং তারা আল্লাহ তাআলার বাস্তব সৃষ্টি। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে আল্লাহ তাআলা জিনদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তাদের ভেতরের বৈচিত্র্য স্পষ্ট করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী (মুসলমান) এবং কিছু অবিশ্বাসী (কাফির)।
’ (সুরা : জিন, আয়াত : ১৪)
শুধু তা-ই নয়, মানুষের মধ্যে যেমন কিছু লোক সৎকর্মশীল আবার কিছু লোক অসৎকর্মশীল হয়, তেমনি জিনদের মধ্যেও বৈচিত্র্য রয়েছে। তারা কেউ কেউ সৎকর্মশীল হয়, আবার কেউ কেউ হয় অসৎকর্মশীল। পবিত্র কোরআনে উদ্ধৃত তাদের বক্তব্যে রয়েছে, ‘আর নিশ্চয়ই আমাদের কিছু সৎকর্মশীল এবং কিছু এর ব্যতিক্রম। আমরা ছিলাম বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত।
’ (সুরা : জিন, আয়াত : ১১)
এই দুই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে জিনদের মধ্যেও ঈমানদার ও কাফির, সৎ ও অসৎ—সব শ্রেণিই বিদ্যমান। তারা বিবেকসম্পন্ন সৃষ্টি এবং শরিয়তের বিধান তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
হাদিসের আলোকে জিনের তিনটি প্রধান
শ্রেণি : প্রকৃতি ও চলাফেরার দিক থেকেও জিনদের বিভিন্ন স্তর আছে। জিনদের প্রকৃতি ও চলাফেরা সম্পর্কে রাসুল (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আবু সা‘লাবা আল-খুশানি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, জিন তিন প্রকার—এক প্রকারের জিনের ডানা আছে, তারা আকাশে উড়ে বেড়ায়; এক প্রকার সাপ ও দুষ্ট জিন (আফরীত); আরেক প্রকার (মানুষের মতো) কোথাও অবস্থান করে এবং কোথাও ভ্রমণ করে।
(সহিহুল জামি, ইবনে হিব্বান)। এই হাদিস থেকে জানা যায়, জিনদের চলাচল, বসবাস ও আচরণ এক রকম নয়। কেউ আকাশে বিচরণ করে, কেউ পশুর আকৃতিতে প্রকাশ পায়, আবার কেউ মানুষের সমাজের আশপাশে বসবাস করে।
ঘরে বসবাসকারী জিন : হাদিসে এমন এক শ্রেণির জিনের কথা এসেছে, যারা মানুষের ঘরে বসবাস করে। এদের বলা হয় আওয়ামিরুল বুয়ূত। এগুলো মাঝে মাঝে সাপের রূপধারণ করে আবির্ভূত হয়। তাই মহানবী (সা.) এ ধরনের সাপ দেখলেই আঘাত করতে নিষেধ করেছেন। একটি হাদিসে ইরশাদ হয়েছে যে একবার এক যুবক ঘরে ঢুকেই দেখতে পেল যে এক বিশালাকার সাপ বিছানার ওপরে কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছে। সে এর প্রতি বল্লম স্থির করে তার মাধ্যমে এটিকে গেঁথে ফেলল। অতঃপর বের করে তা (বল্লমটি) বাড়ির মধ্যেই পুঁতে রাখল। সে সময় তা নড়েচড়ে তাকে ছোবল মারল এবং (ক্ষণিকের মধ্যে) সাপ কিংবা যুবক এ দুজনের কে বেশি দ্রুত মৃত্যুবরণকারী ছিল তা আঁচ করা গেল না। বর্ণনাকারী [আবু সাউদ (রা.)] বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে ঘটনাটি বিবরণ দিয়ে তাঁকে বললাম, আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন, তিনি যেন আমাদের মধ্যে তাকে আবার তাজা করে দেন। সে সময় তিনি বললেন, তোমরা তোমাদের সঙ্গীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো। তারপর বললেন, মদিনায় কিছু জিন রয়েছে, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাই (সাপ ইত্যাদি
রূপে) তাদের কিয়দংশ তোমরা লক্ষ্য করলে তাকে তিন দিন সাবধান সংকেত দেবে; তারপর তোমাদের সম্মুখে (তা) প্রকাশ পেলে তাকে হত্যা করবে। কারণ সে একটি (অবাধ্য) শয়তান (অর্থাৎ সে মুসলিম নয়)। (মুসলিম, হাদিস : ৫৭৩২)
জিনের রূপান্তর ক্ষমতা : মহান আল্লাহ জিনদের বিভিন্ন রূপে রূপান্তর হওয়ার শক্তি দিয়েছেন। যার প্রমাণ বিভিন্ন হাদিসে পাওয়া যায়। যেমন— সহিহ বুখারিতে বর্ণিত, শয়তান একবার গরিব মানুষের আকৃতিতে আবু হুরায়রা (রা.)-এর কাছে এসে সদকার খাদ্য চুরি করেছিল। (বুখারি, হাদিস : ২৩১১)। এ ছাড়া তারা পশুর রূপও ধারণ করতে পারে। হাদিসে আছে, মহানবী (সা.) কালো কুকুরকে শয়তান আখ্যা দিয়েছেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩২১০)
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, জিনেরা বেশির ভাগ সময় কালো কুকুর ও কালো বিড়ালের আকৃতি ধারণ করে; কারণ কালো রঙে শয়তানি শক্তি বেশি এবং এতে তাপীয় শক্তি প্রবল।