আব্দুল হাকিম
শিক্ষায় বঞ্চিত প্রান্তিক শিশুরা, প্রশ্নবিদ্ধ মেগা বাজেট!
প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের কথা বলে বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় হলেও বাস্তবে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না—এমন অভিযোগ নতুন নয়। এবার সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি পিইডিপি-৫। প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—শুধু অবকাঠামো বাড়লেই কি শিক্ষার মান বাড়বে, নাকি এটি আগের ব্যয়বহুল কিন্তু ফলহীন উদ্যোগগুলোরই পুনরাবৃত্তি?
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, পিইডিপি-৫-এর মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য, টেকসই ও উচ্চমানের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। যেখানে প্রতিটি শিশু শক্ত ভিত্তিগত সাক্ষরতা ও গণিত দক্ষতা অর্জন করবে এবং একুশ শতকের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। প্রকল্পের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে নিট ভর্তি হার শতভাগে উন্নীত করা, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী হার ৯০ শতাংশের বেশি করা এবং ঝরে পড়া বা স্কুলের বাইরে থাকা প্রায় দুই লাখ শিশুকে পুনরায় শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
তবে কাগজে-কলমে এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবে কতটা অর্জনযোগ্য, তা নিয়ে সংশয় জোরালো হচ্ছে। কারণ সাম্প্রতিক শিক্ষাগত সূচক ও অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, প্রাথমিক শিক্ষায় সমস্যার মূল জায়গায় বারবারই অবহেলা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের শেখার অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৪ শতাংশ শিশুর প্রাথমিক পাঠ দক্ষতা রয়েছে। একটি ছোটগল্পের অধিকাংশ শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারে ৪০ শতাংশেরও কম শিক্ষার্থী। মৌলিক ও অনুমানভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে মাত্র ৩০ শতাংশ শিশু। গণিতে চিত্র আরও ভয়াবহ—মাত্র ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর মৌলিক সংখ্যাজ্ঞান রয়েছে, যোগ-বিয়োগ করতে পারে ৩৬ শতাংশ এবং সংখ্যা চিনতে পারে মাত্র ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী।
প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রকল্পের মাধ্যমে স্কুল ভবনসহ অবকাঠামো তৈরি হলেও শিশুদের শেখার বাস্তব অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। পিইডিপি-৫ আরএডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সময়ের শেষ দিকে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু সেখানে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এত বড় বাজেটের একটি প্রকল্পে এমন প্রস্তুতির ঘাটতি উদ্বেগজনক।
ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা
এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, প্রাথমিক শিক্ষায় সবচেয়ে বড় সংকট অবকাঠামোর নয়, বরং শেখার। অথচ পিইডিপি-৫-এর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রশাসনিক খাতে। সারা দেশে প্রায় ২৫ হাজার একক শিফট স্কুল বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শিশুবান্ধব মানদণ্ড পূরণকারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হার ৭২.৫ শতাংশ থেকে ৯২ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। ওয়াশ সুবিধা, নিরাপদ পানির উৎস, বাউন্ডারি ওয়াল, ওয়াশ ব্লক এবং নতুন ভবন নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। শুধু নন-রেসিডেন্সিয়াল ভবন নির্মাণেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা।
child-1বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামো প্রয়োজনীয় হলেও সেটিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রকৃত পরিবর্তন আসে শ্রেণিকক্ষের ভেতরে—শিক্ষক কীভাবে পাঠ দিচ্ছেন, শিক্ষার্থী কীভাবে শিখছে এবং সেই শেখার অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তার ওপর। কিন্তু শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক সহায়তা ও শেখার ফলাফল মূল্যায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে পিইডিপি-৫-এর পরিকল্পনা ও ফলাফল কাঠামো স্পষ্ট নয়। আগের পিইডিপি প্রকল্পগুলোতেও শিক্ষক প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছিল। ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি এডুকেশন (ডিপিইডি), সিপিডি কাঠামো চালু থাকলেও শ্রেণিকক্ষে তার বাস্তব প্রতিফলন খুবই সীমিত ছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পিইডিপি-৫-এ কীভাবে কার্যকর পরিবর্তন আনা হবে, সে বিষয়ে ডিপিপিতে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
সমতা ও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নেও পিইডিপি-৫ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল, হাওর এলাকা, শহরের বস্তি, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য আলাদা কৌশলের কথা বলা হলেও বাজেট বরাদ্দে তার প্রতিফলন দুর্বল। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতি বিশ্লেষণ (এনএসএ) ও এমআইসিএস দেখিয়েছে, দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুরাই শেখার সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এসব অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষক, অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ সহায়তা ও বিশেষ শিক্ষাসামগ্রীর প্রয়োজন হলেও প্রকল্পের ব্যয় কাঠামোতে তা অগ্রাধিকার পায়নি।
পিইডিপি-৪-এর মূল্যায়নেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। অবকাঠামো ও ভর্তি হার বাড়লেও শেখার মানে উন্নতি হয়নি। প্রকল্পের প্রায় ১৬ শতাংশ অর্থ অব্যবহৃত থেকে গেছে। শিক্ষক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও শ্রেণিকক্ষভিত্তিক সহায়তায় ঘাটতি রয়ে গেছে। তবু সেই ব্যর্থতার গভীর বিশ্লেষণ ছাড়াই আরও বড় আকারে পিইডিপি-৫ গ্রহণ করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রশাসনিক পর্যায়ে মনিটরিং থাকলেও শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে যে একাডেমিক মনিটরিং দরকার, তা কার্যত নেই।
এই অধ্যাপক বলেন, গত দেড় দশকে শিক্ষা খাতে নেওয়া বেশিরভাগ উদ্যোগ ছিল ভবন নির্মাণ ও অবকাঠামো ভিত্তিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব বেশি থাকায় শিখনমান বাড়াতে পারিনি। অনেক ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণ ও কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে, যা এসব প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রকল্পের মাধ্যমে স্কুল ভবনসহ অবকাঠামো তৈরি হলেও শিশুদের শেখার বাস্তব অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। তিনি জানান, পিইডিপি-৫ আরএডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সময়ের শেষ দিকে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু সেখানে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এত বড় বাজেটের একটি প্রকল্পে এমন প্রস্তুতির ঘাটতি উদ্বেগজনক।