মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি : অর্থ, গুরুত্ব ও বিধান
প্রতীকী ছবি
বান্দার জীবনের পরম প্রত্যাশা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একটি মাধ্যম হলো আল্লাহর ফয়সালা ও সিদ্ধান্তের প্রতি বান্দার সন্তুষ্ট থাকা এবং সন্তোষ প্রকাশ করা। আল্লাহর ফয়সালার প্রতি বান্দার সন্তুষ্টি কেমন হবে নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা করা হলো।
আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার অর্থ
আল্লামা ইবনে আতা (রহ.) বলেন, সন্তুষ্টি হলো আল্লাহ অনাদিকাল পূর্বে আল্লাহ তাঁর বান্দার জন্য যা নির্ধারণ করে রেখেছেন, তার প্রতি হৃদয়ের প্রশান্তি ও তৃপ্তি।
কেননা সে বিশ্বাস করে, আল্লাহ বান্দার জন্য সর্বোত্তম বিষয়টিই নির্ধারণ করেন। ফলে সে তাতে সন্তুষ্ট থাকে। (সালাহুল উম্মতে : ৪/৪৯৩)
আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির গুরুত্ব
বান্দার জন্য আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জন করে।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আদম সন্তানের জন্য আল্লাহ যা ফয়সালা করে রেখেছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকাই হলো তার সৌভাগ্য। আর আল্লাহ তাআলার কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা ছেড়ে দেওয়াই হচ্ছে তার দুর্ভাগ্য এবং আল্লাহ তাআলার ফয়সালার ওপর নাখোশ হওয়াও তার দুর্ভাগ্য।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২১৫১)
আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির প্রকার
আল্লাহর প্রতি বান্দার সন্তুষ্টি তিনভাবে প্রকাশিত হয়। তা হলো—
১. আল্লাহকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা : এটা হলো ইলাহ ও রব হিসেবে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা।
আল্লাহর সঙ্গে কাউকে প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে শরিক না করা। বিশুদ্ধ ঈমানের মাধ্যমে এই সন্তুষ্টি প্রকাশ পায়।
২. আল্লাহর ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকা : এটা হলো আল্লাহর সিদ্ধান্ত, প্রজ্ঞা ও ব্যবস্থাপনার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। এটা বিশ্বাস করা যে আল্লাহ আমার সঙ্গে অন্যায় করেননি, তিনিই আমার প্রতি কল্যাণই করেছেন। আল্লাহর প্রতি সুধারণার মাধ্যমে এই প্রকারের সন্তুষ্টি প্রকাশ পায়।
৩. আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট : জীবনে যা কিছু ঘটে সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, ব্যর্থতা ও সাফল্য তা মেনে নেওয়া এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অনুযোগ না করা। ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি আস্থা প্রকাশের মাধ্যমে এই প্রকারের সন্তুষ্টি প্রকাশ পায়।
আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির বিধান
বান্দার প্রতি আল্লাহর নির্দেশ ও নির্ধারণ দুই প্রকার : ক. দ্বিনি নির্দেশ ও বিধান, খ. জাগতিক নির্ধারণ। শরয়ি নির্দেশ ও বিধান মেনে নেওয়া এবং তা পালন করা বান্দার জন্য ওয়াজিব। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অমান্য করলে সে স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৬)
জাগতিক নির্ধারণ, যা আল্লাহ সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলার অংশ হিসেবে নির্ধারণ করে থাকেন, যেমন রোগ-ব্যাধি, বিপদ-আপদ ইত্যাদি। এগুলোর প্রতি সন্তুষ্টি থাকার বিধান বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কখনো তা ওয়াজিব, কখনো সুন্নত আবার কখনো মুস্তাহাব, কখনো মাকরুহ আবার কখনো হারাম। রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে সবর করা সুন্নত বা মুস্তাহাব। আর হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার পর নির্লিপ্ত থাকা হারাম।
আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকার উপায়
প্রাজ্ঞ ও বুজুর্গ আলেমরা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি অর্জনের পথ হিসেবে নিম্নোক্ত আমলগুলো উল্লেখ করেছেন—
১. আল্লাহর হুকুম মানতে প্রস্তুত থাকা : আল্লাহর হুকুম, নির্দেশ ও নির্ধারণ (তাকদির) মেনে নেওয়ার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা আবশ্যক। ইয়াহইয়া ইবনে মুয়াজ (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়, বান্দা কখন সন্তুষ্টির স্তরে উপনীত হয়? তিনি বলেন, যখন সে নিজেকে চারটি মৌলিক কাজের জন্য প্রস্তুত করে। তা হলো : (আল্লাহ) আপনি আমাকে দান করলে আমি গ্রহণ করব, আমাকে না দিলেও সন্তুষ্ট থাকব, আমাকে ছেড়ে দিলেও ইবাদত করব, আমাকে ডাকলে সাড়া দেব। (মাদারিজুস সালিকিন : ২/৯৭)
২. নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা : নিজের ভালো-মন্দ সব কিছু আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে রাখলে বান্দার জন্য আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা সহজ হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনি তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৩)
৩. আল্লাহর নির্দেশ অনিবার্য : বান্দা যখন বিশ্বাস করবে, আল্লাহর সিদ্ধান্ত অনিবার্য, তখন সে বিপদ-আপদে অস্থির হবে না, কল্যাণের আশায় হায়-হুতাশ করবে না। আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই লিপিবদ্ধ থাকে; আল্লাহর পক্ষে তা খুবই সহজ।’ (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ২২)
৪. আল্লাহ সবচেয়ে কল্যাণকামী : বান্দা অন্তরে এই বিশ্বাস রাখে যে আল্লাহই তার জন্য সবচেয়ে কল্যাণকামী, আমার জন্য চূড়ান্ত কল্যাণ কিসে আছে তা আমি জানি না, তবে তার জীবনে আর কোনো হতাশা থাকবে না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে এমন হতে পারে যে আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন তোমরা তাকেই অপছন্দ করছ।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)
৫. প্রতিদানের আশা করা : বান্দা যদি বিপদ-আপদে আক্রান্ত হলে আল্লাহর কাছে প্রতিদান আশা করে, তবে তার জন্য ভাগ্যলিপিতে সন্তুষ্ট থাকা সহজ হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বিপদ যত তীব্র হবে, প্রতিদানও তত বড় হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতিকে ভালোবাসলে তাদের পরীক্ষা করেন। কেউ তাতে সন্তুষ্ট থাকলে তার জন্য আছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর কেউ তাতে অসন্তুষ্ট হলে তার জন্য আছে অসন্তুষ্টি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০৩১)
৬. দোয়ার আমল করা : আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি লাভের জন্য বান্দা দোয়ার আমল করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় উপনীত হয়ে বলে, আল্লাহ তাআলা আমার রব, ইসলাম আমার দ্বিন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার রাসুল হওয়ায় আমি সর্বান্তঃকরণে পরিতৃপ্ত আছি, তাকে পরিতৃপ্ত করা আল্লাহ তাআলার করণীয় হয়ে যায়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৩৮৯)
সবর সন্তুষ্টির অন্তর্ভুক্ত
বিপদ-আপদে বান্দা যখন কষ্ট পেয়েও ধৈর্য ধারণ করে তা আল্লাহর প্রতি বান্দার সন্তুষ্টির অন্তর্ভুক্ত। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) আবু মুসা আশআরি (রা.)-কে লক্ষ্য করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই সব কল্যাণ সন্তুষ্টিতে নিহিত। যদি তুমি পারো সন্তুষ্ট থাকবে, নতুবা ধৈর্য ধারণ করবে।’ (মাজমুউ ফাতাওয়া : ১০/৬৮৮)
স্বভাবজাত কষ্ট সন্তুষ্টির অন্তরায় নয়
আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশের এটা শর্ত নয় যে মানুষের স্বভাবজাত অপছন্দ, দুঃখ ও বেদনা থাকতে পারবে না, বরং শর্ত হলো স্বভাবজাত পছন্দ ও অপছন্দের ওপর আল্লাহর বিধান ও নির্দেশকে প্রাধান্য দেওয়া। এই উত্তম দৃষ্টান্ত নিম্নোক্ত হাদিস। আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, ‘আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে আবু সাইফ কর্মকারের কাছে গেলাম।…তখন (রাসুলের ছেলে) ইবরাহিম মুমূর্ষু অবস্থায় ছিল। এতে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর উভয় চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। তখন আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনিও? (কাঁদছেন)। তখন তিনি বললেন, অশ্রু প্রবাহিত হয় আর হৃদয় হয় ব্যথিত। তবে আমরা মুখে তা-ই বলি যা আমাদের রব পছন্দ করেন। আর হে ইবরাহিম! তোমার বিচ্ছেদে আমরা অবশ্যই শোকাহত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩০৩)
আল্লাহ সবাইকে তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।