ধর্ম ডেস্ক
সহমর্মিতা: সমাজের প্রাণ
ইসলাম কেবল ইবাদতের নাম নয়, বরং পারস্পরিক অধিকার রক্ষার এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানবিক সমাজ গঠনে ‘সহমর্মিতা’ (Empathy) ও ‘সহানুভূতি’ (Sympathy) ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। অন্যের ব্যথায় ব্যথিত হওয়া এবং সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ানোই মুমিনের পরিচয়।
সহমর্মিতা ও সহানুভূতির ফারাক
অনেকে দুটি বিষয়কে এক মনে করেন, তবে পার্থক্য আছে- সহানুভূতি: অন্যের কষ্ট দেখে কেবল মায়া অনুভব করা। সহমর্মিতা: অন্যের কষ্ট নিজের মধ্যে ধারণ করা। নিজেকে তার জায়গায় কল্পনা করে ব্যথা অনুভব করা।
কোরআনের আলোকে সহমর্মিতার দর্শন
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে মুমিনদের একে অপরের প্রতি দয়ালু হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
নবীজির ব্যাকুলতা: আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল এসেছেন, তোমাদের কষ্ট তার নিকট খুবই কষ্টদায়ক। তিনি মুমিনদের প্রতি করুণাসিক্ত ও দয়ালু।’ (সুরা তাওবা: ১২৮)
জান্নাতিদের বৈশিষ্ট্য: ‘আহার্যের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে অন্নদান করে এবং বলে- আমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য খাওয়াচ্ছি, কোনো প্রতিদান চাই না; কৃতজ্ঞতাও নয়।’ (সুরা ইনসান: ৮-৯)
হাদিসে সহমর্মিতার চিত্র
রাসুলুল্লাহ (স.) সহমর্মিতাকে ঈমানের শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এক দেহ এক প্রাণ: নবীজি (স.) বলেন, ‘মুমিনদের পারস্পরিক দয়া ও ভালোবাসার উদাহরণ একটি শরীরের মতো। দেহের এক অঙ্গে ব্যথা হলে পুরো শরীর জ্বরে আক্রান্ত হয়।’ (সহিহ বুখারি: ৬০১১)
মানসিক আঘাত থেকে রক্ষা: তিনি বলেন, ‘তিনজন একত্রে থাকলে দুজনে যেন গোপনে কথা না বলে। কারণ, এতে তৃতীয়জন মনে কষ্ট পাবে।’ (সহিহ মুসলিম)
আল্লাহর সাহায্য: ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়াবি সংকট দূর করবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার সংকট দূর করবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)
সিরাতে সহমর্মিতার অবিস্মরণীয় নজির
নবীজি (স.) ছিলেন সহমর্মিতার মূর্তপ্রতীক। তাঁর জীবনের কিছু ঘটনা-
এতিমের অভিভাবক: যুদ্ধে সাহাবি বাশির (রা.) শহীদ হলে তাঁর কাঁদুনিরত ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নবীজি বলেন, ‘কেঁদো না। আমি কি তোমার বাবা এবং আয়েশা তোমার মা হলে সন্তুষ্ট নও?’ (উসদুল গাবাহ)
শিশুর কান্না ও নামাজ: জামাতে কোনো শিশুর কান্না শুনলে নবীজি (স.) নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন, যাতে মা কষ্ট না পান। (সহিহ বুখারি)
শত্রুপুত্রের সম্মান: আবু জাহেলের ছেলে ইকরিমা ইসলাম গ্রহণের পর নবীজি সাহাবিদের নির্দেশ দেন, কেউ যেন তাকে ‘আবু জাহেলের ছেলে’ বলে খোটা না দেয়। (মুসতাদরাকে হাকেম)
চরম শত্রুর প্রতিও দয়া: মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনু উবাইয়ের মৃত্যুর পর তার ছেলের অনুরোধে নবীজি (স.) নিজের জামাটি কাফনের জন্য দিয়ে দেন। (সহিহ বুখারি)
সমকালীন বাস্তবতা ও আমাদের করণীয়
আজকের সমাজ প্রযুক্তিগতভাবে সংযুক্ত হলেও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: সামান্য মতপার্থক্য হলেই আমরা ফেসবুকে কাউকে ট্রল করছি বা ধুয়ে দিচ্ছি। অথচ মুমিনের কাজ অন্যের দোষ গোপন রাখা।
পারিবারিক দূরত্ব: স্বামী-স্ত্রী বা ভাই-ভাইয়ের মধ্যে সামান্য ছাড়ে মানসিকতা নেই। সহমর্মিতার অভাবেই পরিবারগুলো ভাঙছে।
রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা: ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা বা টলারেন্স আজ নেই বললেই চলে।
সহমর্মিতা চর্চার উপায়
১. মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনা।
২. কাউকে বিচার (Judge) করার আগে তার পরিস্থিতি বোঝা।
৩. নিজেকে অন্যের জায়গায় কল্পনা করা।
৪. সাধ্যমতো উপকার করা, না পারলে অন্তত সান্ত্বনা দেওয়া।
সহমর্মিতা জান্নাতি সমাজের চাবিকাঠি। আল্লাহ সতর্ক করেছেন, অভাবীদের প্রতি সহমর্মী না হওয়া জাহান্নামে যাওয়ার অন্যতম কারণ (সুরা মুদ্দাসসির)। তাই আসুন, ট্রল বা ঘৃণার বদলে আমরা ভালোবাসার ও সহমর্মিতার সমাজ গড়ে তুলি।