সংবাদ এই সময় ডেস্ক
ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
নস্টালজিয়া শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এমন অনেক সময়ের জন্যও আমরা আকুল হই, যেগুলো নিজেরা কখনো দেখিনি। যেমন: নব্বইয়ের দশক, কিংবা তথাকথিত ‘সহজ সময়’। এ অনুভূতির নাম অ্যানেমোইয়া
নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতা—শব্দটি শুনলেই মনের কোণে এক চিমটি বিষণ্ণতা আর একরাশ ভালো লাগা খেলা করে যায়। এটি এমন এক অদ্ভুত অনুভূতি, যা আমাদের বর্তমান থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এক নিমেষে দাঁড় করিয়ে দেয় ফেলে আসা দিনে।
নস্টালজিয়া শব্দটি এসেছে দুটি গ্রিক শব্দ— ‘নটোস’ (বাড়ি ফেরা) ও ‘অ্যালগোস’ (ব্যথা) থেকে। আক্ষরিক অর্থে এর মানে হলো বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতা বা বেদনা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে নস্টালজিয়া এখন আর কেবল ভৌগলিক সীমানায় আটকে নেই; এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে হারানো সময়ের প্রতি এক গভীর তৃষ্ণা। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, নস্টালজিয়া হলো আমাদের জীবনের ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে জড়িত এক জটিল আবেগ—যাকে বলা হয় অটোবায়োগ্রাফিক মেমোরি। এ অনুভূতি সাধারণত মিষ্টি-কষ্টের মিশ্রণ হলেও বেশিরভাগ সময়ই ইতিবাচক।
মানুষ কেন বারবার অতীতে ফিরে যেতে চায়? মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, বর্তমান যখন খুব বেশি জটিল বা যান্ত্রিক হয়ে ওঠে, তখন মন নিজের অজান্তেই একটি ‘সেফ জোন’ বা নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। আর সেই নিরাপদ আশ্রয়টি হলো আমাদের শৈশব বা কৈশোর।
ব্রেইন-ইমেজিং গবেষণায় দেখা গেছে, নস্টালজিয়া অনুভব করার সময় মস্তিষ্কের ভেতর আবেগী পুনর্মিলন ঘটে। প্রথমে আসে ডোপামিন, তারপর আবেগ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া, আর তার ফলেই জন্ম নেয় এক ধরনের মানসিক আশ্বাস—জীবনের একটা অর্থ আছে।
গবেষকরা দেখেছেন, নস্টালজিয়া আত্মসম্মান বাড়াতে পারে, সামাজিক সম্পর্কের প্রতি আকর্ষণ জাগায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষকে আরো আশাবাদী করে তোলে।
মনোবিদেরা ‘স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট’ বা ‘টেরর ম্যানেজমেন্ট’ তত্ত্বে নস্টালজিয়ার এক আশ্চর্য উপকারিতা খুঁজে পেয়েছেন। ছেলেবেলায় ভাইবোনের খুনসুঁটি বা ঘুড়ি ওড়ানোর চমৎকার স্মৃতি চরম মন্দ অবস্থায়ও মানুষকে তলিয়ে যাওয়া থেকে উদ্ধার করতে পারে। তাই মনোবিদদের পরামর্শ, কোনো স্মৃতিই ফেলনা নয়।
নস্টালজিয়া শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এমন অনেক সময়ের জন্যও আমরা আকুল হই, যেগুলো নিজেরা কখনো দেখিনি। যেমন: নব্বইয়ের দশক, কিংবা তথাকথিত ‘সহজ সময়’। এ অনুভূতির নাম অ্যানেমোইয়া।
বিবিসি সায়েন্স ফোকাস অনুযায়ী, মানুষ শুধু অতীত মনে রাখে না, অতীত কল্পনাও করে—আর সে কল্পনাও হয় বাছাই করা। সিনেমা, বই, ছবি, ফ্যাশন আর সংস্কৃতির মাধ্যমে অতীতের দশকগুলো আমাদের সামনে আসে এক ধরনের আবেগী হাইলাইট রিল হিসেবে। দুঃখ, সংকট আর বৈষম্য আড়ালে চলে যায়, সামনে থাকে শুধু নান্দনিকতা আর এক ধরনের অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি।
অ্যানেমোইয়া মানে সময়ে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা নয়; বরং বর্তমানের অস্থিরতার মাঝে স্থায়িত্ব আর পরিচয়ের খোঁজ।
স্মৃতির গলিতে সবচেয়ে দ্রুত পৌঁছে দেয় গান। পরিচিত কোনো সুর শুনলেই মস্তিষ্ক যেন সেই মুহূর্তে ফিরে যায়। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন রেমিনিসেন্স বাম্প। কৈশোর ও যৌবনের শুরুর সময়টায় আমাদের স্মৃতি সবচেয়ে তীব্র ও আবেগপূর্ণ হয়। সেই সময়ের গান, সিনেমা আর টিভি শো আমাদের মস্তিষ্কে স্থায়ী চিহ্ন এঁকে দেয়। পরিচিত গল্প আর পুনরাবৃত্ত থিমের ভেতর দিয়ে মিডিয়া এক ধরনের সময়যন্ত্রে পরিণত হয়, যা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় এমন এক অতীতে, যাকে মন যত্ন করে আগলে রেখেছে।
তবে নস্টালজিয়ার একটি অন্ধকার দিকও আছে। অতিরিক্ত অতীতমুখী হওয়া মানুষকে বর্তমানে স্থবির করে দিতে পারে। তবে নিয়ন্ত্রিত স্মৃতিচারণ আমাদের অস্তিত্বের শেকড়কে শক্ত করে। আমরা কারা ছিলাম, আর আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি—নস্টালজিয়া সেই সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।