তথ্যপ্রযুক্তির ডেস্ক।
ছবি : সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির ফলে ডিজিটাল জগতে নতুন এক ধরনের প্রতারণা ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির ফলে ডিজিটাল জগতে নতুন এক ধরনের প্রতারণা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। মানুষের মুখ ও কণ্ঠ হুবহু নকল করে তৈরি করা ডিপফেক প্রযুক্তি এখন প্রতারকদের শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন বছরে ডিপফেক-ভিত্তিক প্রতারণার চেষ্টা বেড়েছে দুই হাজার শতাংশেরও বেশি। ব্যক্তি থেকে শুরু করে বড় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাই এখন এ ঝুঁকির মুখে—
ডিপফেক প্রতারণা ও এআই জালিয়াতি কী
ডিপফেক প্রযুক্তিতে এআই-ভিত্তিক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে মানুষের মুখভঙ্গি ও কণ্ঠস্বরের বাস্তবসম্মত অনুকরণ তৈরি করা হয়। শুরুতে বিনোদন, চলচ্চিত্র বা চিকিৎসা গবেষণায় এর ব্যবহার থাকলেও অপরাধীরা দ্রুতই এর অপব্যবহার শুরু করে। বর্তমানে ভিডিও কল, ফোন কল ও অডিও বার্তার মাধ্যমে পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার ছদ্মবেশে প্রতারণা চালানো হচ্ছে।
ডিপফেক কীভাবে প্রতারণায় ব্যবহার হচ্ছে
ডিপফেক তৈরির জন্য প্রতারকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, করপোরেট ওয়েবসাইট কিংবা প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের ভিডিও থেকে ছবি ও কণ্ঠ সংগ্রহ করে। যত বেশি তথ্য পাওয়া যায়, ডিপফেক তত বেশি নিখুঁত হয়। এ কারণে জনপ্রিয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। পরিচিত মুখ ও কণ্ঠ দেখলে মানুষের স্বাভাবিক সন্দেহ কমে যায়। আর এ মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাই ডিপফেক প্রতারণার বড় শক্তি।
বাস্তবে ডিপফেক প্রতারণার কাজের ধরন
ডিপফেক প্রতারণা সাধারণত ধাপে ধাপে পরিচালিত হয়। প্রথমে লক্ষ্যবস্তু ও তার নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গবেষণা করা হয়। এরপর ছবি ও কণ্ঠ ব্যবহার করে কৃত্রিম ভিডিও বা অডিও তৈরি করা হয়। সন্দেহ তৈরি হলে ভুক্তভোগীকে ভিডিও কলে যুক্ত হতে বলা হয়, যেখানে একাধিক ডিপফেক চরিত্র হাজির থাকে। হংকংয়ে এমন এক ঘটনায় একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকর্তা প্রায় ২ কোটি ৫৬ লাখ ডলার ১৫টি আলাদা লেনদেনে স্থানান্তরের অনুমোদন দেন। এক সপ্তাহ পর প্রতারণাটি ধরা পড়ে। একই ধরনের ঘটনায় ২০২৫ সালের মার্চে সিঙ্গাপুরে এক আর্থিক পরিচালক প্রায় ৪ লাখ ৯৯ হাজার ডলার হারান।
ডিপফেক শনাক্ত করার উপায়
ডিপফেক ভিডিওতে চোখের পলক ফেলার অস্বাভাবিকতা, আলোছায়ার অসামঞ্জস্য, ঠোঁট ও কণ্ঠের মিল না থাকার মতো লক্ষণ দেখা যেতে পারে। ত্বকের টেক্সচার অস্বাভাবিক মসৃণ বা বিকৃত হতে পারে। ডিপফেকে অডিও কণ্ঠ একঘেয়ে শোনাতে পারে, স্বাভাবিক আবেগের ঘাটতি থাকে এবং শব্দে হালকা বিকৃতি লক্ষ্য করা যায়। অস্বাভাবিক তাড়াহুড়া, আচরণবহির্ভূত অনুরোধ বা অপ্রত্যাশিত যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার হলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
ডিপফেক প্রতারণা থেকে সুরক্ষায় করণীয়
ব্যক্তিগত পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ সীমিত রাখা জরুরি। সব গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে দুই স্তরের যাচাই ব্যবস্থা চালু করা এবং শক্তিশালী, আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে হবে। অর্থ সংক্রান্ত অনুরোধ এলে অবশ্যই ভিন্ন মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের লেনদেনে বহুস্তর অনুমোদন, নির্দিষ্ট নম্বরে কলব্যাক নীতি ও নিয়মিত কর্মী প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। লাইভনেস ডিটেকশন প্রযুক্তি, কণ্ঠ যাচাই ব্যবস্থা এবং আচরণ বিশ্লেষণভিত্তিক এআই সিস্টেম ডিপফেক প্রতারণা শনাক্তে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
ডিপফেক এখন এক বাস্তব সংকট
ডিপফেক প্রতারণা এখন আর সম্ভাব্য ঝুঁকি নয়, এটি বাস্তবেও দ্রুত বিস্তার করা একটি সংকট। তাই বর্তমানে সচেতনতা, প্রযুক্তিগত সুরক্ষা ও সতর্ক আচরণের সমন্বয়ই এ ঝুঁকি মোকাবেলার প্রধান উপায়। এজন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যা-ই হোক না কেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তী বড় প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। —টেক টাইমস অবলম্বনে