শাকিলা জেরিন
‘জীবন হয়তো এক বাক্স চকোলেটের মতো’—বিখ্যাত এই উক্তিটির সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। কিন্তু ভালোবাসা দিবসে হৃদয়ের কথা স্রেফ দুটি শব্দে বুঝিয়ে দিতে এক বাক্স ‘কনভারসেশন ক্যান্ডি হার্টস’-এর কোনো বিকল্প নেই। স্মার্টফোন বা টেক্সট মেসেজের যুগেও ‘Be Mine’ কিংবা ‘Kiss Me’ লেখা এই ছোট ছোট রঙিন ক্যান্ডিগুলো আজও প্রেমের চিরচেনা এক অনুষঙ্গ। তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো, আজকের এই রোমান্টিক ক্যান্ডিগুলোর যাত্রা কোনো প্রেমের গল্প দিয়ে নয়, বরং একটি ওষুধের দোকান থেকে।
ওষুধের টেবিল থেকে ক্যান্ডির বয়ামে
১৮৪৭ সালের কথা। বোস্টনের ফার্মাসিস্ট অলিভার চেজ গলা ব্যথা বা পেটের সমস্যার জন্য এক ধরনের ঔষধি লজেন্স তৈরি করতেন। তখন এই লজেন্সের মণ্ড হাতে বেলে কাটতে হতো। কাজটিকে সহজ করতে চেজ একটি স্বয়ংক্রিয় মেশিন আবিষ্কার করেন, যা আমেরিকার ক্যান্ডি শিল্পের ইতিহাসে প্রথম আধুনিক যন্ত্র। এই উদ্ভাবন থেকেই জন্ম নেয় ‘নিউ ইংল্যান্ড কনফেকশনারি কোম্পানি’ বা ‘নেকো’ (NECCO)। চেজ ভাইয়েরা শুরুতে একে চেজ লজেন্স নাম দিয়েছিল, যা স্বাদ, স্থায়িত্ব এবং সস্তা দামের কারণে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তীতে উদ্যোক্তারা এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘নেকো ওয়েফার্স’ (NECCO Wafers)।
দীর্ঘ চিঠি যখন ছোট বার্তায়
১৮৬৬ সালে কোম্পানিটি প্রথম ‘কনভারসেশন ক্যান্ডি’ বাজারে আনে। চেজ ভাইদের আরেকজন, ড্যানিয়েল চেজ উদ্ভিজ্জ রঙ ব্যবহার করে ক্যান্ডির ওপর অক্ষর ছাপানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তবে শুরুর দিকে এগুলো আজকের মতো ছোট হৃদপিণ্ড আকৃতির ছিল না। তখন বড় আকৃতির ক্যান্ডিতে লেখা হতো দীর্ঘ বাক্য, যেমন—’How long shall I have to wait? Please be considerate.’
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ‘সুইটহার্টস’
১৯০২ সালে প্রথমবার ছোট ও হৃদপিণ্ড আকৃতির ক্যান্ডি বাজারে আসে এবং দীর্ঘ বাক্যের জায়গা নেয় ছোট ছোট রোমান্টিক শব্দ। কিছু ধ্রুপদী উক্তি আছে যা একদম শুরু থেকেই সুইটহার্টস ব্র্যান্ডের অংশ হয়ে আছে। ‘Kiss Me’ এবং ‘Be Mine’ তার মধ্যে অন্যতম। এছাড়া ‘Sugar Pie,’ ‘Sweet Pea,’ ‘Cutie Pie’ এবং ‘Crush on You’-এর মতো বার্তাও রয়েছে।
আধুনিক যোগাযোগমাধ্যমই হোক বা পপ সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মেলানো, যোগ হয়েছে ‘টোয়াইলাইট’ (Twilight) ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে মিলেয়ে ‘Bite Me’ এবং ‘Live 4 Ever’-এর মতো বার্তা। ২০২১ সালে স্প্যাংলার ধ্রুপদী প্রেমের গানের কথা ব্যবহার করে, যেমন: ‘At Last,’ ‘I Got U Babe,’ এবং “Lean on Me”।
সুইটহার্টস বিহীন এক ভ্যালেন্টাইন’স ডে
২০১৮ সালে মূল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘নেকো’ দেউলিয়া হয়ে গেলে ক্যান্ডি হার্টসের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। শত বছরের ইতিহাসে ২০১৯ সালে প্রথমবার ভ্যালেন্টাইন’স ডের বাজারে কোনো ‘সুইটহার্টস’ ছিল না। ভক্তদের হাহাকার আর সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার পর স্প্যাংলার কোম্পানি ব্র্যান্ডটিকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে। ২০২০ সালে যখন পুরনো স্বাদ ও রঙে ক্যান্ডিগুলো বাজারে ফেরে, তখন ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে দেয়—পুরনো চাল ভাতে বাড়ে, আর পুরনো ক্যান্ডি প্রেম বাড়ায়।
ভিডিওতে দেখুন: ঔষধি লজেন্স থেকে যেভাবে ‘ভ্যালেন্টাইন’ স আইকন’ হয়ে উঠল ক্যান্ডি হার্টস
স্বাদ নিয়ে বিতর্ক
সুইটহার্টস ক্যান্ডির খড়খড়ে বা ‘চক্কি’ স্বাদটি অনেকের কাছেই বিতর্কিত। ২০১০ সালে একবার কোম্পানিটি স্বাদ বদলে আধুনিক করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ভক্তদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে তারা আবার পুরনো ফর্মুলায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়। বোঝা যায়, মানুষ কেবল ক্যান্ডি খেতে নয়, বরং ঐতিহ্যের সেই নস্টালজিয়া আর পুরনো স্বাদটুকু ফিরে পেতেই বেশি আগ্রহী।
আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় যেখানে ইমোজির ছড়াছড়ি, সেখানে পকেটে থাকা এক টুকরো ক্যান্ডি আর তাতে লেখা ‘Love You’ আজও এক বিশেষ আবেদন ধরে রেখেছে।