ধর্ম ডেস্ক
সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র রমজানকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে এখন সাজ সাজ রব। আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণ আর ভ্রাতৃত্বের এই মাসে মুসলিম বিশ্ব যেমন নিজস্ব ঐতিহ্যে সাজছে, তেমনি ইউরোপের দেশগুলোতেও দৃশ্যমান হচ্ছে রমজানের বর্ণিল আলোকচ্ছটা। কায়রোর শতাব্দীপ্রাচীন ফানুস থেকে শুরু করে বেলজিয়ামের রাজপথের আলোকসজ্জা- সব মিলিয়ে রমজান আজ বৈশ্বিক সংস্কৃতির এক অনন্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কায়রোর অলিগলিতে ফানুসের জয়গান
রমজান এলেই মিসরের রাজধানী কায়রোর পুরোনো শহর যেন এক জীবন্ত রূপকথায় পরিণত হয়। সরু গলি, ব্যস্ত হাটবাজার আর শতাব্দীপ্রাচীন কারিগরদের হাতে তৈরি তামা ও লোহার রঙিন ফানুস (Fanoos) নগরজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি করে। ইতিহাসবিদদের মতে, ফাতেমীয় যুগ থেকে এই ঐতিহ্যের সূচনা।
কায়রোর ঐতিহাসিক মোমবাতির বাজার বা ‘সুক আল-শামাইন’ একসময় রমজান ও ঈদ উপলক্ষে বিশাল মোমবাতি ও ফানুসের শোভাযাত্রার জন্য বিখ্যাত ছিল। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আল-মাকরিজি তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, মামলুক যুগেও তারাবির নামাজে বিশাল বিশাল মোমবাতি জ্বালানোর রেওয়াজ ছিল। সময়ের বিবর্তনে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লেও কায়রোর এই শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য ম্লান হয়নি। বাব জুয়াইলার কারিগররা আজও তামা ও লোহার ফানুসে নিখুঁত কারুকাজ করে সেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন। বর্তমানে আধুনিক বৈদ্যুতিক মোমবাতির চাহিদাও বেড়েছে, যা পুরোনো ধাঁচের ফানুস সংরক্ষণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বেলজিয়ামের ঘেন্টে আলোকসজ্জার নতুন দিগন্ত
ঐতিহ্যবাহী কায়রোর বিপরীতে আধুনিক ইউরোপেও রমজান উদযাপনে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। বেলজিয়ামের ঘেন্ট (Ghent) শহরে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সড়কজুড়ে আলোকসজ্জার যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল, তা এখন সেখানকার এক অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। শহরের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা- বেভ্রাইডিংসলান-ফিনিক্সস্ট্রাট এবং ভন্ডেলগেমস্ট্রাট রমজানজুড়ে বিশেষ আলোক সজ্জায় সেজে ওঠে।
‘অ্যাসোসিয়েশন অব ঘেন্ট মস্কস’ (ভিজিএম) ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই আয়োজন এখন ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ রমজান উৎসবে রূপ নিয়েছে। আয়োজকদের মতে, এর মাধ্যমে রমজানকে কেবল একটি ধর্মীয় মাস হিসেবে নয়, বরং শহরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সামাজিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হয়। প্রতিদিন ইফতারের সময়ের সাথে মিল রেখে এই আলো জ্বালানো হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বৈশ্বিক আবহে রমজান ও আলোক উৎসব
কেবল মিসর বা বেলজিয়াম নয়, গত কয়েক বছর ধরে জার্মানির কোলোন, নেদারল্যান্ডসের কয়েকটি শহর এবং লন্ডনের পিক্যাডিলি সার্কাসেও রাজকীয় রমজান আলোকসজ্জা দেখা যাচ্ছে। লন্ডনের রাস্তাগুলোতে এখন বড়দিনের মতো বর্ণিল আলোকসজ্জার মাধ্যমে সিয়াম পালনকারীদের শুভেচ্ছা জানানো হয়। এই উদ্যোগগুলো প্রবাসে বসবাসরত মুসলিম কমিউনিটির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করছে।
মাহে রমজান শান্তি, সহনশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক। দেশ ও সংস্কৃতিভেদে উদযাপনের ধরন আলাদা হলেও সবার লক্ষ্য এক- সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন। শতাব্দীর প্রাচীন ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এই মেলবন্ধন প্রমাণ করে, রমজানের বারতা সর্বজনীন এবং তা যুগের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে আনন্দের আলো ছড়ায়।