নুরুল আলম।
ক্যালেন্ডারের পাতা বলছে আজ পহেলা ফাল্গুন। ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। ইট-পাথরের এই রুক্ষ শহরেও আজ বাসন্তী রঙের জোয়ার লেগেছে। টিএসসি, শাহবাগ, কিংবা ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর- যেদিকেই চোখ যায়, শুধুই হলুদ, কমলা আর বাসন্তী শাড়ির মেলা। খোঁপায় গাঁদা ফুল, কপালে টিপ, আর পরনে নতুন শাড়ি জড়িয়ে নগরবাসী প্রস্তুত বসন্তবরণে।
কিন্তু ক্যামেরাটা যদি একটু ‘জুম আউট’ করি? যদি রঙিন লেন্সটা সরিয়ে খালি চোখে তাকাই? তাহলে বাসন্তী রঙের নিচেই ভেসে ওঠে এক ধূসর, বিবর্ণ ঢাকা। যেখানে বাতাসের রং হলুদ নয়, বরং ধুলোর আস্তরণে খয়েরি; যেখানে বসন্তের কোকিলের ডাক চাপা পড়ে যায় হাইড্রোলিক হর্নের কর্কশ শব্দে।
অন্যবার ফাল্গুন মানেই ছিল বইমেলার ধুলোমাখা আড্ডা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে দীর্ঘ লাইন, নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আর লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের জটলা। কিন্তু এবারের বাস্তবতা ভিন্ন। ক্যালেন্ডারে বসন্ত এলেও, প্রাণের মেলা এখনো শুরু হয়নি। বাংলা একাডেমি আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটগুলো হয়তো আজ কিছুটা নিস্তব্ধ।
মেলাহীন এই ফাল্গুনে উৎসব আছে, কিন্তু সেই চিরচেনা গন্তব্যটা নেই। তাই মানুষের ভিড় হয়তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়বে শহরের অন্যান্য প্রান্তে, কিন্তু মনের ভেতরে একটা ‘মিসিং’ অনুভূতি কাজ করবে সারাদিন। বইমেলা ছাড়া বসন্তবরণ যেন অনেকটা সুর ছাড়া গানের মতো— বাজে, কিন্তু ঠিক জমে না।
এবার রাস্তার দৃশ্যপটের দিকে তাকানো যাক। রিকশায় বসে আছেন বাসন্তী শাড়ি পরা এক তরুণী, পাশে হয়তো তার প্রিয়জন। তাদের হাসিমুখ, চুলে তাজা ফুল। কিন্তু এই সুখের ছবিটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন যিনি, সেই রিকশাচালক মামার দিকে কি আমাদের চোখ পড়ে? তার গায়ের শার্টটা হয়তো গত তিন দিন সাবান-পানির দেখা পায়নি। তার কপালে যে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, তা বসন্তের রোমান্টিকতা নয়, বরং জীবন যুদ্ধের ক্লান্তি। তার কাছে আজকের দিনটি ‘বসন্ত উৎসব’ নয়, বরং ‘বাড়তি ভাড়ার দিন’। জ্যামে আটকে থেকে যখন যাত্রী বিরক্ত হন, রিকশাচালক তখন ভাবেন আজকের দিনে চাল-ডালের দামটা একটু ম্যানেজ করা যাবে তো? একই রাস্তায় দুটি সমান্তরাল পৃথিবী—একদিকে উৎসবের রং, অন্যদিকে বেঁচে থাকার ধূসর সংগ্রাম।
সিগন্যালে গাড়ি থামতেই ছুটে আসে ছোট্ট শিশুটি। হাতে প্লাস্টিকের ঝুড়িতে গাঁদা আর গোলাপের মালা। কাকুতি-মিনতি করে বলছে, “ভাইয়া, একটা মালা নেন, আপুর জন্য।” আমরা হয়তো ১০-২০ টাকা দিয়ে মালা কিনে ভাবি বসন্তবরণ করলাম। কিন্তু যে শিশুটি অন্যের মাথায় বসন্ত পরিয়ে দিচ্ছে, তার নিজের জীবনে কি বসন্ত এসেছে? তার হাতগুলো রুক্ষ, চুলে জট, পায়ে হয়তো স্যান্ডেলও নেই। স্কুলের ইউনিফর্ম পরার বয়সে সে ফেরি করছে অন্যের উৎসব। তার কাছে বসন্ত মানে আনন্দ নয়, বসন্ত মানে শুধুই ‘সেলস টার্গেট’। এই যে হাজার হাজার টাকার ফুল বিক্রি হচ্ছে আজ, তার লভ্যাংশ কি এই পথশিশুদের জীবনে কোনো রং ছড়ায়? নাকি দিনশেষে সেই ফুটপাতে মলিন চাদর মুড়ি দিয়েই তাদের ঘুমাতে হয়?
শহরের বাস্তবতা হলো—উৎসব মানেই জ্যাম। আগারগাঁও থেকে মতিঝিল কিংবা উত্তরা থেকে টিএসসি— মেট্রোরেলের স্টেশনে আজ তিল ধারণের ঠাঁই নেই। রাস্তায় বের হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকার পর উৎসবের সেই ‘ফুরফুরে’ মেজাজটা কি আর অবশিষ্ট থাকে? সাজগোজ করে বের হওয়া মানুষগুলো যখন ধুলো আর কালো ধোঁয়ায় মলিন হয়ে যায়, তখন বিরক্তি কাজ করাটাই স্বাভাবিক।
অনেকের কাছে এখন উৎসব মানেই ‘সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট’। জ্যামে বসে, ঘামে ভিজে একাকার হয়েও আমরা মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে সেলফি তুলি। ক্যাপশনে লিখি— ‘বসন্ত এসে গেছে’। কিন্তু ফোনের স্ক্রিন অফ করলেই ফুটে ওঠে ক্লান্ত, বিরক্ত এক মুখ। আমরা কি তবে উৎসবকে অনুভব করার চেয়ে ‘দেখানো’র প্রতিযোগিতায় বেশি মেতেছি? প্লাস্টিক ফুলের মতোই আমাদের আনন্দগুলোও কি এখন ফিল্টার সর্বস্ব হয়ে যাচ্ছে?
এত সব নেতিবাচকতা, এত ধূসরতা, বইমেলা না থাকার হাহাকার আর ধুলোবালি—সব সত্য। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটাও তো আছে। এই যে এত কষ্টের পরেও মানুষ হলুদ শাড়িটা পরেছে, জ্যাম ঠেলে টিএসসিতে যাচ্ছে—এটাই তো এই শহরের মানুষের টিকে থাকার শক্তি।
ঢাকা এমন এক শহর, যেখানে প্রতিদিন যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়। এখানে বাতাস বিষাক্ত, রাস্তা স্থবির। এই একঘেয়ে, যান্ত্রিক আর ধূসর জীবনে মানুষ হাঁপিয়ে ওঠে। তাই তারা উপলক্ষ খোঁজে। পহেলা ফাল্গুন আসলে শুধু ঋতু বদলের দিন নয়, এটি নগরবাসীর জন্য এক নিশ্বাসের দিন। ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে মানুষ যখন চুলে ফুলটা গোঁজে, তখন তারা আসলে নিজেদের জানান দেয়—‘আমরা এখনো ফুরিয়ে যাইনি’।
বইমেলা নেই তো কী হয়েছে? মানুষ ঠিকই নিজের মতো করে বসন্ত খুঁজে নেবে। রিকশার জ্যামে বসে, মেট্রোরেলের ভিড়ে দাঁড়িয়ে, কিংবা রাস্তার ধারের টং দোকানে চায়ের কাপ হাতে—বাঙালি ঠিকই হাসবে। এই হাসিটাই হলো ধূসর ক্যানভাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল রং। বাসন্তী রঙের আড়ালে জীবন হয়তো ধূসর, কিন্তু সেই ধূসরতাকে ঢেকে দেওয়ার সাহসটুকু আছে বলেই এই শহর আজও এত প্রাণবন্ত। ধুলোবালি আর কষ্টের সমীকরণ মিলিয়েই আমাদের বসন্ত, আমাদের বেঁচে থাকা।