ধর্ম ডেস্ক
রোজা: মুক্তির ঢাল
মুমিনের জীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা হলো পরকালে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া। পবিত্র রমজানের রোজা একজন মুমিনকে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করার প্রধান হাতিয়ার। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (স.) রোজাকে ‘জুননাহ’ বা ঢাল হিসেবে অভিহিত করেছেন। যুদ্ধের ময়দানে ঢাল যেমন শত্রুর আঘাত থেকে রক্ষা করে, রোজা তেমনি মুমিনকে পরকালীন বিপদ থেকে সুরক্ষা দেয়।
সুরক্ষার রক্ষাকবচ
রাসুলুল্লাহ (স.) রোজার এই সুরক্ষা ক্ষমতাকে যুদ্ধের ময়দানের ঢালের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের মাঠে ঢাল যেমন তোমাদের রক্ষাকারী, রোজাও তদ্রূপ জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়ার ঢাল।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৩৯)। অন্য বর্ণনায় নবীজি (স.) বলেন, ‘সিয়াম ঢালস্বরূপ এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার এক মজবুত দুর্গ।’ (মুসনাদে আহমদ: ৯২২৫)
ঢাল যখন অকার্যকর হয়
একটি ঢাল ততক্ষণই যোদ্ধাকে সুরক্ষা দেয়, যতক্ষণ তা অক্ষত থাকে। ঢাল ভেঙে গেলে বা ফুটো হয়ে গেলে শত্রু সহজেই আঘাত করতে পারে। রোজার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘রোজা হলো ঢালস্বরূপ। সুতরাং রোজাদার যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং জাহেলি আচরণ না করে। যদি কেউ তার সাথে ঝগড়া করতে চায় বা গালি দেয়, সে যেন দুই বার বলে- আমি রোজাদার।’ (সহিহ বুখারি: ১৮৯৪)
অন্য হাদিসে এসেছে- ‘রোজা ঢালস্বরূপ, যতক্ষণ না তা বিদীর্ণ (নষ্ট) করে ফেলা হয়।’ (মুসনাদে আহমদ: ১৬৯০) সাহাবায়ে কেরাম জানতে চেয়েছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কীভাবে তা বিদীর্ণ হয়? নবীজি (স.) উত্তরে বলেছিলেন- ‘মিথ্যা অথবা গিবতের (পরনিন্দা) মাধ্যমে।’ (আল-মুজামুল আওসাত, তবারানি: ৪৫৩৬)
পবিত্রতা রক্ষার শর্ত
গিবত ও মিথ্যা ইসলামে গুরুতর পাপগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এ দুই গুনাহের কারণে রোজা সরাসরি ভেঙে না গেলেও এর আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও সুরক্ষার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। বিখ্যাত তাবেয়ি মুজাহিদ (রহ.) বলেন, ‘দুটি অভ্যাস থেকে যে বেঁচে থাকবে, তার রোজা নিরাপদ থাকবে- গিবত ও মিথ্যা।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ৮৯৮০)
তাকওয়ার মূল চেতনা
রমজান মূলত তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের মাস (সুরা বাকারা: ১৮৩)। আর তাকওয়ার মূল কথা হলো সব ধরনের গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। যে ব্যক্তি রোজা রেখে পাপাচার ত্যাগ করতে পারল না, তার উপবাস আল্লাহর কাছে গুরুত্বহীন। নবীজি (স.) সতর্ক করেছেন- ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা, মন্দ কাজ ও মূর্খসুলভ আচরণ ছাড়ল না, তার পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (সহিহ বুখারি: ৬০৫৭)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘অনেক রোজাদার এমন আছে, যাদের রোজা পালনের সার হলো কেবল তৃষ্ণার্ত আর ক্ষুধার্ত থাকা।’ (আল-মুজামুল কাবির, তবারানি: ৫৬৩৬)। সুতরাং কেবল পানাহার বর্জন নয়, বরং জবান, কান ও মনকে পাপাচার থেকে মুক্ত রাখাই রোজার প্রকৃত দাবি।
রোজার এই ঢালকে বিদীর্ণ হওয়া থেকে রক্ষা করতে হলে রমজানে মিথ্যা, গিবত ও ঝগড়া-বিবাদসহ যাবতীয় গুনাহ বর্জন করা অপরিহার্য। তবেই এই ইবাদত কেয়ামতের কঠিন দিনে মুমিনকে সুরক্ষা দেবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার রোজাকে একটি ‘নিখুঁত ঢাল’ হিসেবে কবুল করুন। আমিন।