ইফতেখারুল ইসলাম, চট্টগ্রাম
ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করেছে ১০টিতে। সময় যত গড়াচ্ছে মনোনয়নবঞ্চিতদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ তত বেশি প্রকাশ পাচ্ছে। এর মধ্যে ৫টি আসনে বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যেকারণে শান্তিতে নেই বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্তরা।
মিরসরাই, ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা এবং বাঁশখালী আসনে বিএনপির একাংশ দলের সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ। কোনো কোনো আসনে বিদ্রোহটা প্রকাশ্যে এসে গেছে। আবার কোনো কোনো আসনে সাংগঠনিকভাবে মনোনয়ন পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। মূলত দলীয় কোন্দল মেটাতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্তরা এখন চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। এক পক্ষ মশাল মিছিল কিংবা অন্য কোনো শোডাউন দিলে তার পাল্টা হিসেবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীকেও তার পাল্টা কর্মসূচি করতে দেখা যাচ্ছে। যা মনোনয়নপ্রাপ্তদের সামনে ভোটযুদ্ধের আগে নিজ দলের একাংশের সঙ্গে আরেক যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সামিল।
এই আসনে দলের মনোনয়ন পুনর্বিবেচনা করতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে চিঠি দিয়েছেন বিএনপি নেতারা। বুধবার (১৯ নভেম্বর) দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা এই চিঠি দেন।
তারেক রহমানকে দেওয়া ওই চিঠিতে বলা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গসহ নানাবিধ অপরাধের দায়ে দল থেকে বহিষ্কৃত নুরুল আমিন চেয়ারম্যানকে দলের প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়ায় দলটির তৃণমূল নেতারা বিস্মিত হয়েছেন। এছাড়া মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। যার দরুণ এই আসনটি আগামী নির্বাচনে বিএনপির কাছ থেকে হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
বিএনপি নেতারা ওই চিঠিতে আরও লিখেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, জবরদখল, চাঁদাবাজি এবং পতিত আওয়ামী লীগের নেতাদের ব্যবসা-বাণিজ্য হাতবদলের মতো অপরাধে যুক্ত ছিলেন দলের মনোনয়ন পাওয়া নুরুল আমিন চেয়ারম্যান।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে দেওয়া ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন, দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য প্রফেসর এমডিএম কামাল উদ্দিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম উত্তরজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক নুরুল আমিন, মিরসরাই উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী, মিরসরাই উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আলিউল কবির ইকবাল, মিরসরাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল আউয়াল চৌধুরী, সদস্যসচিব আজিজুর রহমান চৌধুরী, উপজেলা বিএনপির সদস্য জিয়াদ আমিন খান, মিরসরাই পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক জামশেদ আলম, সদস্যসচিব কামরুল ইসলাম লিটন, বারইয়ারহাট পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক মাঈন উদ্দিন লিটন ও সদস্যসচিব জসিম উদ্দীন।
এই আসনে মনোনয়ন ঘোষণার পর বেশ কিছুদিন নীরব ছিল। মনোনয়নপ্রাপ্ত সরোয়ার আলমগীর সবার সঙ্গে যোগাযোগ করে মান ভাঙ্গানোর চেষ্টা করেছেন। ৭ নভেম্বর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কর্ণেল (অব.) আজিম উল্লাহ বাহার এবং বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী সরোয়ার আলমগীর পৃথক কর্মসূচি পালন করে। সেদিন থেকে বাহারের অনুসারীরা প্রার্থী পূনর্বিবেচনার দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করে। আজিম উল্লাহ বাহারের অভিযোগ হলো, দল যখন চূড়ান্ত মনোনয়ন ঘোষণা করবে তখন তিনি ধানের শীষের প্রার্থীর সঙ্গে কাজ করবেন। চূড়ান্ত মনোনয়নের আগ পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম তার নেতৃত্বে হতে হবে। সরোয়ার আলমগীর সেটা করছেন না। তাই তার অনুসারীরা ক্ষেপেছেন।
এই আসনে মনোনয়ন ঘোষণার দিন সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ড আসনে লায়ন আসলাম চৌধুরীর অনুসারীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তাণ্ডব চালায়। কয়েকদিন পর ধীরে ধীরে উত্তেজনা কমে। তবে এই ঘটনায় বিএনপির সাত নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। সে সময় আসলাম চৌধুরী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তার অনুসারীদের আশ্বস্থ করেন এটা প্রাথমিক মনোনয়ন। চূড়ান্ত মনোনয়ন তিনিই পাবেন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়েই তিনি নির্বাচন করবেন। তবে সীতাকুণ্ড আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্ত কাজী সালাউদ্দিনের প্রচার-প্রচারণা দিন দিন বাড়ছে। ক্রমান্বয়ে বিপরীতমুখী কিছু নেতাকর্মীও তার কাছে ভিড়ছে।
এই আসনে সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামকে প্রার্থী ঘোষণার পরপর বিপরীত কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে কয়েকদিন না যেতেই দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব লায়ন হেলাল উদ্দিনের অনুসারীরা প্রার্থী পূর্নবিবেচনার দাবি জানায়। ১২ নভেম্বর রাতে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভ ও মশাল মিছিল এবং সড়ক অবরোধ করেন তারা।
এবিষয়ে সরোয়ারা জামাল নিজাম বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি কুচক্রী মহল দলের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা নষ্টের পাঁয়তারা করছে। তবে সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে আনোয়ারা-কর্ণফুলির নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।
এই আসনে বিএনপি প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী। তার প্রার্থীতা ঘোষণার কয়েকদিন পর ৬ নভেম্বর ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতা লিয়াকত আলীর অনুসারীরা মশাল মিছিল করে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। তারা বাঁশখালী আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি তোলেন।
তাদের অভিযোগ দীর্ঘ ১৭ বছর মাঠের রাজনীতির সাথে লেয়াকত আলীর সম্পর্ক। তাকে মনোনয়ন না দিয়ে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে মনে করেন তার অনুসারীরা।
লেয়াকত আলী সাংবাদিকদের বলেন, এখন যেটা প্রকাশ করা হয়েছে সেটি প্রাথমিক মনোনয়ন। চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, দল সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে তিনি তার প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করে একটা সিদ্ধান্ত নেবেন।