মিজানুর রহমান (বাবুল) সম্পাদক সংবাদ এই সময়।
একথা বলা অত্যন্ত যৌক্তিক হবে যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির মূল ভিত্তি। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ এখনো গ্রামীণ এলাকায়ই বসবাস করে এবং তাদের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি এবং কৃষিনির্ভর কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলতে গেলে কৃষি যে চারটি উপ-খাত নিয়ে গঠিত সে বিষয়টি প্রারম্ভিক আলোচনায় ধারণা দেওয়াই উত্তম। না হয় পরবর্তীতে আলোচনার খেল হারিয়ে যেতে পারে। আমরা সাধারণত কৃষি বলতে শস্য খাতকেই বুঝি। কিন্তু শস্য, মৎস্য, পশুপালন ও বনায়ন। এ চারটি খাতের সমন্বয় হলো কৃষি খাত। পরিষ্কারভাবে কৃষি খাতের সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে খাতভিত্তিক ধারণা না দিতে পারলে আলোচনা ফলপ্রসূ হয় না।
কৃষির চারটি উপ-খাতে কোনোটিতেই উল্লেখযোগ্যভাবে আধুনিকতার স্পর্শ লাগেনি। শস্য খাত দেশের মধ্যাঞ্চল ও সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় বহুলাংশেই প্রকৃতিনির্ভর চাষাবাদ। দেশের মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৮.৫ মিলিয়ন হেক্টর। ধান চাষের মধ্যে বোরো ধানই উল্লেখযোগ্য। যে ধানের উৎপাদন প্রায় ৯৫ শতাংশ সেচের ওপর নির্ভরশীল অথচ সেচব্যবস্থা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল বলে এ উৎসের অতিরিক্ত ব্যবহারে পানির স্তর যাচ্ছে নিচে নেমে। ডিজেল ও বিদ্যুৎনির্ভর সেচব্যবস্থা জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়ার প্রতিফলন ঘটে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে। নদী ও খালের নাব্য হ্রাস পাওয়ায় বাড়ছে জলাবদ্ধতা। আর বাস্তবিকভাবেই বাংলাদেশে সমন্বিত সেচব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। একথা স্মরণে রাখা একান্তভাবেই অত্যাবশ্যক যে, যথাযথ সেচব্যবস্থাবিহীন শস্য উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নত বীজ ব্যবহারের অপ্রতুলতাও শস্য উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য বাধা। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, শতকরা ৪০-৪৫ ভাগ কৃষক নিজস্বভাবে সংগ্রহ করা বীজ ব্যবহার করে। কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অননুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করে শতকরা ৩০-৩৫ ভাগ চাষি। ফলে কৃষক কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন না পাওয়ায় তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল থেকে যায়। কৃষক পরিবারগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়- যে শুধু নিজের জমি চাষ করে, নিজের জমির সঙ্গে অন্যের জমিও চাষ করে এবং শুধু বর্গা জমি চাষ করে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পিএইচডি গবেষকের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের ফলাফলে প্রতীয়মান হয়েছে যে, নিজের জমি চাষ করা কৃষকদের উল্লেখযোগ্য অংশ নিজ জমির সঙ্গে অর্থনেতিক সমস্যার কারণে অন্যের জমি চাষ করতে বাধ্য হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে এরকম কৃষক পরিবারের সিংহভাগ পরিণত হচ্ছে শুধু বর্গাচাষিতে। এটাই বিদ্যমান গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রকৃত চাষিদের অবস্থা।
গ্রামীণ অর্থনীতির আর একটি উল্লেখযোগ্য খাত হচ্ছে মৎস্য খাত। সরেজমিন মাছচাষির সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে- মধ্যম ও ক্ষুদ্র পর্যায়ের মাছচাষিরা উন্নতমানের মাছের পোনা সংগ্রহ করতে ব্যর্থ, প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাব, মারাত্মক রোগবালাই, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারজাতকরণের সমস্যা (স্থানীয় বাজারে মোট বিক্রয়ের টাকার শতকরা ৮ ভাগ থেকে ১৫ ভাগ পর্যন্ত খাজনা দিতে হয়), অধিকাংশ গ্রামে নেই হিমাঘার, মাছের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও রোগবালাই রোধের প্রয়োজনীয় উপকরণের চড়ামূল্য, মৎস্য জলাশয় থেকে মাছ চুরি-ডাকাতি বিষয়ক সমস্যার কথা। গভীর পর্যবেক্ষণ একথা বলে যে, মধ্যম ও ক্ষুদ্র পর্যায়ের মাছচাষিরা ধীরে ধীরে মাছ চাষের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। একথা এখানে বলা প্রয়োজন যে, বৃহৎ আকারের মৎস্যচাষিরা মূলত গ্রামের অধিবাসী নন। তারা মূলত করপোরেট দুনিয়ার বিনিয়োগকারী।
এ পর্যায়ে আমরা গ্রামীণ অর্থনীতির অন্য এক চালিকাশক্তি গবাদিপশু পালন বিষয়ে যৎসামান্য আলোচনা করব। গবাদিপশু পালন বিষয়ে বিদ্যমান বর্তমান চিত্র মৎস্য চাষের বহুলাংশের মতোই। কৃষক পরিবারগুলো যে গাভির দুধ বিক্রি করে ওই গাভি দিয়ে সে হাল চাষ করে। ফলাফল হলো, ফলপ্রসূ ওই গাভি থেকে কাঙ্ক্ষিত দুধ পাওয়া যায় না। সরেজমিন গবেষণা জরিপ একথা বলে যে, একটি গ্রামের দু-চারটি কৃষক পরিবার তাদের পালিত গাভিকে স্থানীয় পশুপালন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে উন্নতমানের বাচ্চা পাওয়ার প্রত্যাশায় ইনজেকশনের মাধ্যমে উন্নত বীজ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার কারণে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত ফল পায় না। উপজেলা পর্যায়ে দেখা যায় যে, উপজেলার জনসংখ্যা ২ লাখ থেকে আড়াই লাখ, সেখানে পশুপালন কর্মকর্তার সঙ্গে চিকিৎসা সহায়তার জন্য অভিজ্ঞ সহকারী রয়েছে এক থেকে দুজন। যে কারণে চাষির গাভি, গাভির বাচ্চা, গর্ভবতী গাভি, মোটাতাজাকরণের জন্য পালিত গরুর যথাসময়ে যথোপযুক্ত চিকিৎসা না দিতে পারায় চাষির ভাগ্যে নেমে আসে ঘোর আঁধার। হারায় মূলধন। এমন অবস্থাও দেখা গেছে যে, চাষিকে কিস্তির ভিত্তিতে এনজিও থেকে গৃহীত ঋণ পরিশোধের জন্য চাষাবাদযোগ্য জমি ঠিকা (বন্ধক ব্যবস্থার চেয়ে চাষির জন্য অধিকতর ক্ষতিকর) পদ্ধতির আওতায় ফসলি জমির বিপরীতে অর্থ সংগ্রহ করে উল্লিখিত ঋণ পরিশোধ করতে হয়। যে কৃষক পরিবার বছর ধরে দু-একটি গরু, ছাগল লালন-পালন করে কোরবানির সময়ে বিক্রি করে লাভবান হবেন কিন্তু সেই কৃষক পরিবার উল্লিখিত সময়ে গরুর বিক্রয়মূল্য এতই ওঠা-নামা করে যে, প্রায়শই তার ভাগ্য বাজার অর্থনীতির জুয়া খেলার শিকার হয়।
এ ছাড়া হাঁস-মুরগি পালনেও রয়েছে বিভিন্ন সমস্যা; গবাদি পশুপালন, হাঁস-মুরগি লালন-পালনে যে খাদ্যের প্রয়োজন তা সহজলভ্য নয়। প্রকৃতিগত ঘাস এখন আর তেমন না পাওয়ায় নির্ভর করতে হয় ফিটজাতীয় খাবারের ওপর। যা চড়া মূল্যে কিনে মুনাফার নাগাল পাওয়া ভীষণ কঠিন। রোগবালাই রোধে প্রয়োজনীয় ওষুধের দামও চড়া। এ খাত থেকে প্রকৃত চাষি পরিবারের লাভের মুখ দেখা অনেকাংশই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কৃষির উপ-খাতগুলোর চতুর্থ খাত হিসেবে বনায়নের প্রসঙ্গে বলতে গেলে বলতে হয় যে, আগেকার সময়ের চেয়ে পারিবারিক বনায়ন ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কাঠের বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন পণ্য বাজার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় কাঠের ব্যবহারিক মূল্য অন্য পণ্যের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। আর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অকৃষক পরিবারগুলো বসতবাড়ি, দোকানপাঠ নির্মাণে কাঠের বিকল্প ব্যবহার করেন।
গ্রামীণ অর্থনীতির অন্য একটি উল্লেখযোগ্য খাত হচ্ছে কুটিরশিল্প। এ খাতের বিদ্যমান সারসংক্ষেপ এককথায় বলতে গেলে গ্রামীণ কুটিরশিল্পের বারোটা বেজে গেছে করপোরেট কুটিরশিল্পের ধাক্কায়।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থ প্রবাহ বাড়াতে সহায়তা করত এমন আরও কিছু পেশার কথা না বললেই নয়। যেমন, প্রাকৃতিক উৎস থেকে মৎস্য আহরণ (নদী, খাল থেকে)। গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় উজানের বালু প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে বড় বড় নদীগুলোর বুকে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। নদীতে যেমন কমে গেছে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্তব্য মৎস্য, ভাটির পানির স্রোত কমে যাওয়ায় নদী-খালের পানিতে লবণাক্ততা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় মিঠা পানির মাছ গেছে কমে। কোনো কোনো মিঠা পানির মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যে কারণে প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ আহরণকারী জেলেরা অধিকাংশ কর্মহারা হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অধিকাংশ খাল তো ভরাট হয়েছে। একসময়ে ভরাট হয়ে যাওয়া নদী, খালগুলোয় নৌকা চালিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জীবিকানির্বাহ করত। এখন তো নৌকা চোখেই পড়ে না বরং ট্রলারের নিঃসরিত তেল-মবিলে বাড়ছে পানির দূষণমাত্রা।
গ্রামীণ অর্থনীতির সম্ভাবনা ছিল, এখনো আছে- প্রয়োজন সুষ্ঠু ভাবনা, যথার্থভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও গৃহীত পদক্ষেপগুলো যত সচল হবে জাতীয় অর্থনীতির থলি তত হবে পরিপূর্ণ। অর্থনীতির চলমান সমূদয় তত্ত্ব একথাই বলে যে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সৃষ্টির মধ্যদিয়ে শিল্পজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার সৃষ্টি হয় এবং কৃষি খাতের উদ্বৃত্ত শ্রম স্থানান্তর ঘটে শিল্প খাতে। পাশাপাশি শিল্প খাতে কর্মরত শ্রমিকরাও তাদের ক্রয়সীমার মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয় করতে পারে। যেসব উন্নত দেশ ধাপে ধাপে শিল্পবিপ্লব সম্পন্ন করে এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পর্যায়ে আছে তারা শিল্প খাতের উন্নয়নের আগে কৃষিবিপ্লব সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে। আর কৃষিবিপ্লব সম্পন্ন করার মানে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে পরিপূর্ণ অবদান রাখা। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এ কথার বিকল্প নেই।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিদ্যমান সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কৃষির প্রতিটি উপ-খাতের সমস্যা যথাযথভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। তার পর ধরে ধরে আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতির বিকাশের ধারাকে মাথায় রেখে কৃষি খাতের বাস্তবসম্মত সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তার জন্য প্রয়োজন হবে কৃষিবান্ধব দক্ষ মানবসম্পদ নিয়োগসহ চাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত চাষি ও কৃষিশ্রমিকের কৃষির আধুনিকীকরণ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া। দেশের অভ্যন্তরে কৃষিবিষয়ক যন্ত্রপাতি, উপকরণ, উৎপাদনের ব্যবস্থা করা। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ বিষয়ক সমস্যার সমাধান করে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করা আব্যশক।