মন্জুরুল ইসলাম
পৃথিবীতে সৃষ্ট সব শরীরী-অশরীরী, পার্থিব-অপার্থিব, জীব-জড়, আইনকানুন, নিয়মনীতিরই স্বতন্ত্র সৌন্দর্য আছে। সেই সৌন্দর্যের বিপরীতে কদাকার দিক-চিত্রও আছে। কে কোনটা, কিভাবে গ্রহণ করবে সেটা প্রতিটি মানুষের নিজস্ব স্বাধীনতা। তবে প্রকৃত স্বাধীনতা হলো আইনকানুন, নীতি-আদর্শ মেনে চলা।
সত্য, ন্যায়-সুন্দরকেই মনেপ্রাণে ধারণ করা। সবকিছুরই এপিঠ-ওপিঠ থাকলেও বাংলাদেশের রাজনীতির বহু পিঠ। দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ অন্য কিছু বিশেষ না বুঝলেও রাজনীতিটা বোঝে ভালো। বলা চলে, একটু বেশিই বোঝে।
নানান ধারার, নানান কিসিমের রাজনীতিতে অভ্যস্ত আমরা। আমাদের মতো এত রাজনৈতিক দল পৃথিবীর খুব কম দেশেই আছে। আবার আমাদের রাজনীতি শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বিদেশেও এসব রাজনৈতিক দলের শাখা আছে। তাদের তৎপরতাও মাঝেমধ্যেই দেখা যায়।
অথচ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তাদের নির্বাচনী রাজনীতিতে ধারাবাহিকভাবে দুটি প্রধান দলের আধিপত্য চলছে। ১৮৫০ সাল থেকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং রিপাবলিকান পার্টি একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রাজনীতি করছে। প্রতিবেশী বৃহৎ দেশ ভারতে সর্বভারতীয় পর্যায়ে মাত্র ছয়টি জাতীয় রাজনৈতিক দল রয়েছে। অবশ্য কিছু আঞ্চলিক, প্রাদেশিক দলও আছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৬০টি।
অনিবন্ধিত দল কত আছে এর কোনো সঠিক তথ্য নেই। সাধারণ মানুষের রাজনীতি বোঝা ও অনেক রাজনৈতিক দলের বিকাশও রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
চুয়ান্ন বছরের স্বাধীন বাংলাদেশ রাজনীতির শত ফুল ফোটার উর্বর ভূমি। সে কারণেই দলের অভাব নেই, নেতারও অভাব নেই। আবার ওলটপালট রাজনীতিরও যেন শেষ নেই। রাজনৈতিক নেতারা স্বার্থের কারণে নিজের আদর্শের চেহারা রাতারাতি আমূল পাল্টে ফেলেন। প্রশ্নের মুখোমুখি হলে বলেন, ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।’ সে কারণেই ক্ষমতার লোভ, ষড়যন্ত্র পিছু ছাড়ছে না। রাজনীতিতে পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে নির্বাচন করে দেওয়ার জন্য তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকারের মতো মুরুব্বি ডাকতে হয়। আমরা এখন তেমনই ‘অন্তর্বর্তী’ মুরুব্বিদের শাসনামলে আছি। তারা অনেক কিছু করার চেষ্টা করেছেন। তাদের ব্যর্থতা-সফলতার অঙ্ক এখনই মেলানো যাবে না। সামনে তাদের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিশন ইতিমধ্যে তফসিলের মাধ্যমে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ইনশাল্লাহ। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে এখন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ চলছে। একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং প্রায় বিলীন। দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর নানান দমনপীড়ন, ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বিকশিত। বিএনপি নেতা-কর্মীরা উজ্জীবিত। দলটির চেয়ারপারসন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দেশের সব রাজনৈতিক দল তার জন্য দোয়া করছে। এটাই রাজনীতির সৌন্দর্য। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ প্রবাস জীবনের ইতি টেনে দেশে ফিরবেন। তারপর আগামী নির্বাচনে বিজয়ের লক্ষ্য নিয়ে দলটি পুরোদমে নির্বাচন অভিমুখে দৃপ্তযাত্রা শুরু করবে। দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এখন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির ওপর দিয়েও রীতিমতো ঝড় বয়ে গেছে পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের শাসনামলে। অনুকূল পরিবেশে দলটি এখন সবচেয়ে স্বস্তিকর অবস্থায় আছে। আগামী নির্বাচনে বড় ধরনের চমক দেখানোর প্রত্যাশা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী কাজ করছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু চমক দেখিয়েছে। নির্বাচনের আগে বিস্ময়কর চমক হলো বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এবং পাঁচবার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের জামায়াতে যোগদান। আরো অনেক চমক হয়তো অপেক্ষা করছে। মনোনয়নবঞ্চিত অনেক বিএনপি নেতাই জামায়াতের এমন চমকের তালিকায় আছেন বলে জানা গেছে। মেজর আখতারের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। তিনি অনেক দিন আমার কাছে এসেছেন তার কোনো বক্তব্য বা লেখা ছাপানোর অনুরোধ নিয়ে। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে নানান এজেন্ডা নিয়ে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনে নিয়মিত লিখেছেনও। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর তিনিসহ আরো কয়েকজনের লেখা ছাপতে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদকীয় পর্ষদ অনীহা প্রকাশ করে। বিষয়টি তাদের সসম্মানে জানিয়েও দেওয়া হয়। এ নিয়ে ২১ নভেম্বর সেনা কুঞ্জের সশস্ত্র বাহিনী দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি আমার সঙ্গে চরম অসৌজন্যমূলক, বিব্রতকর পরিস্থিতির অবতারণা করেন। কারও লেখা ছাপা-না ছাপার কারণে অমন অত্যন্ত সুধী সমাবেশে একটি দৈনিকের নির্বাহী সম্পাদকের সঙ্গে যে ভাষায়, যে দেহভঙ্গিতে কথা বলেন, তা শুধু সভ্যতাবিবর্জিত, গর্হিতই নয়; তার মানসিক সুস্থতা নিয়েও সন্দেহের উদ্রেক করে। এ সময় মেজর জেনারেল পদমর্যাদার অবসরপ্রাপ্ত একজন সেনা কর্মকর্তা আমার কাছে ঘটনার কারণ জানতে চান। কারণ বললে তিনি মহাবিরক্ত বোধ করে ইংরেজিতে একটি শব্দ উচ্চারণ করেন, যা এখানে ছাপা শোভন হবে না। পরে তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনি ধৈর্য সহকারে পরিস্থিতি হ্যান্ডল করেছেন, সেজন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’ এ কথা বলে তিনি আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে অন্যদিকে চলে যান। আমিও মন থেকে দুর্গন্ধ ধুলোর গ্লানি ঝেড়ে ফেলি। কোন খুুঁটির জোরে ২১ নভেম্বর তিনি আমার সঙ্গে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের সাহস পেয়েছিলেন, তা সেদিন না পারলেও, এখন বুঝতে পারছি। মেজর আখতার জামায়াতে যোগদানের পর একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। ওই সাক্ষাৎকার ইউটিউব ও ফেসবুকে সম্প্রচারিত হয়েছে। সেখানে অনেকেই লাইক-কমেন্ট করেছেন। একজন কমেন্ট করেছেন, ‘দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাকে হেদায়েত দান করেন।’ তার প্রতি আমারও একই দোয়া। যদিও সে ব্যাপারে খুব আশাবাদী হওয়া যায় না। জামায়াতের মতো একটি সুশৃঙ্খল দলে মেজর আখতারের স্বস্তি না অস্বস্তি অর্জন হলো, নাকি অখ্যাতির কারণ হবেন তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। তবে নীতি-আদর্শের এমন ওলটপালটও রাজনীতির একটা সৌন্দর্য।
আগামী নির্বাচনে বড় ধরনের চমক দেখানোর প্রত্যাশা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী কাজ করছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু চমক দেখিয়েছে। নির্বাচনের আগে বিস্ময়কর চমক হলো বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এবং পাঁচবার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের জামায়াতে যোগদান
ফেব্রুয়ারিতে দেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে হবে গণভোট। পতিত ও কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ছাড়া শান্তিপূর্ণ ভোটের প্রত্যাশা দেশের সব শান্তিপ্রিয় মানুষের। নির্বাচন ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি সম্পর্কে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং আইনের আওতা থেকে পলাতক একজন ব্যক্তির নেতৃত্বে থাকা সংগঠনকে বিশ্বের কোনো গণতন্ত্রমনা দেশই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিতে পারে না। নির্বাচন তো দূরের কথা।’ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘ফ্যাসিস্ট শক্তি নির্বাচন বানচালের চক্রান্ত করছে।’ অর্থাৎ নির্বাচন বানচালের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র যে হচ্ছে, সেটা নানাভাবেই স্পষ্ট। যারা পতিত, যারা রাজনীতি ও নির্বাচন করার অযোগ্য, তারা দেশে শান্তিপ্রিয় নির্বাচন করতে দিতে চাইবে না, এটাই স্বাভাবিক। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পরদিন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলা নির্বাচন বানচালেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ অবস্থায় সরকার, নির্বাচন কমিশন, সব রাজনৈতিক দল ও দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নির্বাচনটা হতেই হবে। নির্বাচনই হলো রাজনীতি ও গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এ সৌন্দর্য ধারণ করতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ বিবর্ণ হবে। নির্বাচন না হলে দেশকে বিরাজনীতিকরণ ও মাইনাস ফর্মুলার উদ্ভাবকরা হায়েনার মতো উন্মত্ত উল্লাস করবে। পরাজিত হবে রাজনীতি ও গণতন্ত্র। সময়মতো নির্বাচন না হলে আজ যারা রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে কথা বলছেন, সেই অধিকারও হয়তো থাকবে না।
আমাদের রাজনীতির প্রধান ফসল হলো স্বাধীনতা। রাজনীতিসচেতন সাড়ে ৭ কোটি মানুষের মধ্যে কিছু বিভ্রান্ত মানুষ ছাড়া প্রায় সবাই পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা চেয়েছেন। যারা বিভ্রান্ত ছিলেন অথবা অদূরদর্র্শী ভুল রাজনীতি দ্বারা দিগ্ভ্রান্ত ছিলেন তারা পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেন। ১৯৭১ সালে তাদের তত্ত্ব ছিল যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যাওয়ার অর্থ হলো ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ। তাদের সেই তত্ত্বে কিছু মানুষ রাজাকার, আলবদর, আলশামস হয়েছে। তাদের কারণে দেশের মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ও বিপক্ষের শক্তির বিরোধ এখনো বিদ্যমান। মাত্র এক দিন আগে আমরা বিজয় উৎসব উদ্যাপন করেছি। সব বিজয়েই পক্ষ-বিপক্ষ থাকে। আমাদেরও আছে। যারা একদিন দেশের জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন, বিজয়ের দিনে তারা সেই গৌরবের পতাকা তুলে ধরেছেন। সবাই জাতীয় স্মৃতি সৌধে জড়ো হয়েছেন। জাতির বীরসন্তানদের শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করেছেন। আর যারা একাত্তরে পরাজিত ছিলেন, তারা স্মৃতি সৌধে যাননি। সুতরাং একাত্তরে যারা জয়ী হয়েছিলেন তাদের মনে ছিল বিজয়ের উল্লাস। আর যারা পরাজিত হয়েছিলেন, তাদের মনে এখনো কাজ করছে পরাজয়ের প্রতিশোধস্পৃহা! অর্থাৎ যারা বিজয়ের জন্য যুদ্ধ করেছেন তারা একাত্তর ধারণ করেন। আর যারা বিজয় চাননি তারা একাত্তর মুছে ফেলতে চান। রাষ্ট্রের জন্মের বিভাজন তাই এখন আরো স্পষ্ট। নির্বাচন সামনে রেখে সেই বিভাজন রেখা দীর্ঘ হচ্ছে। এমন বিভাজন আমাদের পেছনে টানছে। রাজনীতির সব সিদ্ধান্ত সব সময় সঠিক হবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে লোকদেখানো ভুল স্বীকার না করে, প্রকৃত অর্থেই ভুলকে ভুল হিসেবে স্বীকার করে নিলে বিভক্তির রাজনীতি বন্ধ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। হাতে হাত রেখে একসঙ্গে চলার পরিবেশ তৈরি হয়। এটাও রাজনীতির একটা সৌন্দর্য। এর মহিমা আরো উজ্জ্বল করতে সবাই মিলে যে কোনো মূল্যে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচন হলেই মুক্তি পাবে গণতন্ত্র। দেশবাসী শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও মুক্ত গণতন্ত্রের অপেক্ষায়। বিজয় দিবসে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ভোটের ওপর নির্ভর করছে আপনার আমার সবার ভবিষ্যৎ। ভোট রক্ষা আর দেশ রক্ষা করা সবার সমান দায়িত্ব।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
manju209@yahoo.com