লাইফস্টাইল ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে বন্ধ্যত্ব একটি বড় সমস্যা। আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে চলেছে বন্ধ্যত্ব। সন্তান হচ্ছে না। এ সমস্যা কার? মেয়ের। এ বিষয়ে পুরুষকে কমই দোষারোপ করা হয়। আর কোনো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান অধিকাংশ মানুষ। এটি মোটেও ঠিক নয়; অথচ বন্ধ্যত্ব নারী-পুরুষ— উভয়ের ক্ষেত্রেই হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার দায় অনেকটাই পুরুষের। কারণ পুরুষেরও বন্ধ্যত্ব হয়। এতে অগণিত পুরুষ ভুগছেন। চর্বিজাতীয় বা মসলাযুক্ত খাবার, বিভিন্ন নেশা, রাতের শিফটে কাজ এবং অতিরিক্ত মানসিক সমস্যা তৈরি করে বন্ধ্যত্ব।
সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, পুরুষদের শুক্রাণুর গুণমান কমে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে— ডেস্কে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করে যাওয়া। দেশের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ ও আমেরিকার হার্ভার্ড স্কুল অব মেডিসিনের গবেষণায় তেমনটাই দাবি করা হয়েছে।
একাটানা বসে কাজ করার বিপদ মহাগুরুতর। নতুন গবেষণা অনুসারে, পুরুষ মানুষ দীর্ঘক্ষণ ডেস্কে বসে কাজ করা এবং কম শারীরিক কার্যকলাপ বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। যেমন ধরা যাক— যিনি টানা ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় বসে রয়েছেন, তার শরীরের তাপমাত্রার বদল হবে। বিশেষ করে শুক্রাশয়ের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে।
এ বিষয়ে চিকিৎসক মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, শুক্রাশয়ের তাপমাত্রা শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে ২-৪ ডিগ্রি কম থাকে। এবং সেটি থাকাই বাঞ্ছনীয়। তাহলেই শুক্রাণুর উৎপাদন স্বাভাবিকভাবে হবে। শুক্রাশয়ের তাপমাত্রা যদি বৃদ্ধি পায়, তাহলে শুক্রাণুর উৎপাদনে প্রভাব পড়বে।
অনেকেই আঁটসাঁট প্যান্ট পরেন, এটি বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। একে তো আপনি একই জায়গায় বসে কাজ করছেন, তার ওপর খুব আঁটসাঁট পোশাক কিংবা অতিরিক্ত চাপা অন্তর্বাস পরেছেন, এতে শুক্রাশয়ের কোষের ক্ষতি হয়। এতে শুক্রাণুর উৎপাদন কমে যায়। এটিই বন্ধ্যত্ব হওয়ার লক্ষণ।
আবার দেখা গেল, আপনি বাড়িতে কোলে ল্যাপটপ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কাজ করছেন, এ ক্ষেত্রে বিপদ আরও বেশি। ল্যাপটপ থেকে বেরোনো তাপ শুক্রাশয়ের তাপমাত্রার হেরফের যেমন ঘটাবে, ঠিক তেমনই তার ফলে শরীরে হরমোনের ভারসাম্য বিগড়ে যাবে। এতে শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান কমবে। ল্যাপটপ থেকে যে তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ নির্গত হয়, তা যদি দিনের পর দিন সরাসরি ধাক্কা দেয়, তাহলে বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
আবার অন্যদিকে রাতের শিফটে অনেককেই কাজ করতে হয়। বিশেষ করে মিডিয়া ও তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের রাতভর জেগে কাজ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে রাতের শিফটে যদি একটানা বসে থাকেন অথবা খুব বেশি পরিমাণে চা-কফি কিংবা জাঙ্কফুড খান, তাহলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হবে। ফলে শুক্রাণুর উৎপাদন কমে যাবে। এই দীর্ঘক্ষণ সময় একই জায়গায় বসে থাকার কারণে পেলভিক অঞ্চলে রক্ত সঞ্চালন কমে যেতে পারে, যা শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ ছাড়া বসে কাজ করার আরও একটি সমস্যা হলো ওজন বৃদ্ধি। আপনার ভুঁড়ির আকার যত বাড়বে, ততই বিপাকক্রিয়ার হার কমে যাবে। প্রদাহ বাড়বে। আর অতিরিক্ত প্রদাহ শুক্রাশয়ের জন্য মোটেই ভালো নয়।
এ বিষয়ে গবেষকরা ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সি প্রায় এক হাজার ২০০ পুরুষের শুক্রাণুর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছেন। তাতে দেখা গেছে, যারা পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় কোলে ল্যাপটপ রাখেন অথবা একই জায়গায় টানা বসে কাজ করেন, তাদের শুক্রাণুর উৎপাদন প্রায় বন্ধই হয়ে যায়। একসময় বন্ধ্যত্ব হয়ে যায়। তখন তিনি সন্তান জন্মদানে অক্ষম হন।
তবে গবেষকরা কয়েকটি উপায় বাদলে দিয়েছেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক—
১. একটানা বসে কাজ করা যাবে না। প্রতি ৩০-৪৫ মিনিট অন্তর উঠে হাঁটাহাঁটি করতে হবে। স্ট্রেচিং করে নিতে পারলে খুবই ভালো।
২. প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে টাটকা শাকসবজি ও ফল খান। জিঙ্ক ও সেলেনিয়াম আছে এমন খাবার যেমন ডিম, বাদাম ও নানা রকম বীজ রাখুন ডায়েটে। প্রক্রিয়াজাত খাবার— চিনিযুক্ত পানীয় ও জাঙ্কফুড সবসময় এড়িয়ে চলুন।
৩. অতিরিক্ত ধূমপান ও মদপান শুক্রাণুর মান ও গতিশীলতার ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। কাজেই নেশার মাত্রা কমিয়ে দিন।
৪. আর রাতের শিফটে কাজ করলে চা-কফির মাত্রা কমিয়ে দিতে হবে। খিদে পেলে ড্রাই ফ্রুট্স রাখুন হাতের কাছে। পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি। এতে আপনার স্বাস্থ্যে ঘাটতি কমে যাবে।
৫. সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ৩০-৪৫ মিনিট শরীরচর্চা করুন। কারণ হাঁটাহাঁটি, সাইকেল চালানো, দৌড়োনো, সাঁতার— যে কোনো রকম ব্যায়াম করলে আপনি সুস্থ থাকবেন।