মিজানুর রহমান(বাবুল)সম্পাদক সংবাদ এই সময়।
রোববার যুগান্তরে প্রকাশিত পৃথক প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির এক গভীর ও বহুমুখী সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। একদিকে বিনিয়োগ স্থবিরতা ও ক্রমবর্ধনশীল বেকারত্ব, অন্যদিকে মারাত্মক গ্যাস সরবরাহ সংকট-এই দুই সংকট দেশের শিল্প ও কর্মসংস্থান খাতকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, একদিকে বছরে প্রায় ২০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার হতাশাজনক। অন্যদিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যাংক ঋণের আকাশছোঁয়া সুদের হার, কাঁচামাল ও জ্বালানির সংকট ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে শিল্পোদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না, এমনকি বর্তমান প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলস্বরূপ, শিল্পের উৎপাদন গতিতে লাগাম টানতে হচ্ছে, বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে এবং পণ্যের কাটতি না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা কঠিন দুঃসময় পার করছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে চাকরির বাজারে। বিবিএস-এর জরিপ অনুযায়ী, প্রায় এক কোটি মানুষ তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না, যা কার্যত বেকারের সংখ্যাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। শিক্ষিত বেকারদের অবস্থা আরও করুণ; দুর্বল কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থার কারণে তাদের বড় অংশই সার্টিফিকেট-নির্ভর হয়ে পড়ছেন, যা চাকরির বাজারে তাদের অযোগ্য করে তুলছে।
উল্লেখ্য, বিনিয়োগের পথে জ্বালানি সংকটও অন্যতম বড় বাধা হিসাবে দাঁড়িয়েছে। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ ও সারের জন্য গ্যাসের চাহিদা যেখানে দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুট, সেখানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৭০ কোটি ঘনফুট। পেট্রোবাংলা আশঙ্কা করছে, ২০২৬ সালে উৎপাদন আরও কমতে পারে, বিশেষত মার্কিন কোম্পানি শেভরনসহ সরকারি ক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন কমার পূর্বাভাস রয়েছে। যদিও সরকার ৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে, তবে অধিকাংশেরই কাজ শুরু না হওয়ায় অনিশ্চয়তা কাটছে না। এ পরিস্থিতি বিদ্যমান শিল্প, বিশেষ করে টেক্সটাইল খাতকে মারাত্মক চাপের মুখে ফেলেছে। এ পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, আগামী বছরের জন্য গ্যাস সরবরাহ এবং কোন খাতে কত বরাদ্দ হবে, সেই চূড়ান্ত পরিকল্পনাই এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।
এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সরকারের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনের পর একটি বিনিয়োগবান্ধব নীতির স্বচ্ছ রূপরেখা প্রদান করা অত্যাবশ্যক। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ঋণের সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা, যাতে উদ্যোক্তারা সহজে পুঁজি বিনিয়োগ করতে পারেন। তৃতীয়ত, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, যেমন নতুন কূপ খনন দ্রুত শেষ করা এবং এলএনজি আমদানির নিশ্চয়তাপত্র অবিলম্বে সরবরাহকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। চতুর্থত, শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে কর্মমুখী ও আন্তর্জাতিক চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করা। এবং সবশেষে, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, উচ্চ কর এবং দুর্বল অবকাঠামো-বিনিয়োগের এই সুনির্দিষ্ট বাধাগুলো অপসারণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।