মিজানুর রহমান(বাবুল)সম্পাদক সংবাদ এই সময়।
বর্তমান বিশ্ব নতুন এক পণ্যের বাজারে পরিণত হয়েছে; আর তা হলো, ডেটা মার্কেট বা তথ্যবাজার । এই বাজারে ব্যক্তিগত তথ্য, ভোক্তার আচরণগত তথ্য, ব্যাবসায়িক কার্যক্রমের তথ্য এবং সামাজিক ডেটাই সবচেয়ে মূল্যবান পণ্য । বলা চলে, এই পণ্যই এখন ক্ষমতা, এই পণ্যই উন্নয়ন, এই পণ্যই আগামী বিশ্বের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। তাই বিশ্বনেতৃবৃন্দ এই পণ্যকে নতুন অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছেন।
একসময় অর্থ বলতে বোঝানো হতো স্বর্ণ, রূপা, জমি বা পণ্যসম্পদকে, কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক যুগে এসব শারীরিক সম্পদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তথ্য। কারণ, একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগ পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ বা ব্যবহারকারীর আচরণ বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপাদান হলো ‘তথ্য’ । তথ্য বিশ্লেষণ করে বড় বড় প্রতিষ্ঠান নতুন পণ্য নির্মাণ, টার্গেটেড বিজ্ঞাপন, বাজার সম্প্রসারণ এবং প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়াইয়ে এগিয়ে থাকে; যেমন—নেটফ্লিক্স তার ব্যবহারকারীদের দেখার (ভিউ) ইতিহাস বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের জনপ্রিয় কনটেন্টের সম্ভাবনা অনুমান করে এবং সেই অনুযায়ী সিরিজ ও সিনেমা তৈরি করে। একইভাবে গুগল, অ্যামাজন, ফেসবুক বা আলিবাবার মতো কোম্পানিগুলো মূলত তথ্যভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনা করে এবং এর মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার আয় করে থাকে। তারা ব্যবহারকারীর পছন্দ, আচরণ, অনুসন্ধান, কেনাকাটা সবই তথ্য আকারে সংগ্রহ করে এবং ব্যাবসায়িক কৌশল তৈরি করে । তাই আজকের বিশ্বে অর্থনীতি আর কেবলই পুঁজি বা শ্রমনির্ভর নয়, বরং তথ্যনির্ভর অর্থনীতি বৈশ্বিক বাজারকে পরিচালনা করছে। তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্থের এই প্রতিযোগিতায় মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং, বিগ ডেটা এবং ক্লাউড কম্পিউটিং। তথ্যের সঠিক ব্যবহার একটি প্রতিষ্ঠানকে যেমন বিশ্বসেরা করতে পারে, তেমনি তথ্য ফাঁস বা তথ্যের অপব্যবহার একটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসও করে দিতে পারে । তাই এই বাজারে প্রতিযোগিতা শুধু পণ্য বা সেবার ওপর নয়, বরং তথ্যের নিখুঁত ব্যবস্থাপনার ওপরও নির্ভরশীল ।
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে, তথ্যই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এবং ক্ষমতার মূল উৎস । যেখানে আগে ‘অর্থই সব কিছু মনে করা হতো, সেখানে এখন তথ্যের শক্তি অর্থের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে । তথ্য বিভিন্ন উপায়ে অর্থ উপার্জন করতে, উদ্ভাবন করতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে, যা একে এক নতুন ধরনের সম্পদে পরিণত করেছে। চিরাচরিত নিয়মে অর্থ বিনিময়ের একটি মাধ্যম হলেও, তথ্যের মাধ্যমে নতুন সুযোগ তৈরি করা, ব্যাবসায়িক কৌশল নির্ধারণ করা এবং মূল্যবান সম্পদ অর্জন করা সম্ভব; যেমন—বর্তমান ডিজিটাল যুগে, ডেটা বিশ্লেষণ এবং তথ্যের সঠিক ব্যবহার যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে । আবার, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াকরণ করা হয়, যা এই ধারণাকে আরো শক্তিশালী করে তোলে। সুতরাং, ‘তথ্যই অর্থ’ কেবল একটি কথা নয়, বরং এটি বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে তুলে ধরে, যেখানে তথ্যই অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্যের প্রধান চালিকাশক্তি। তথ্য কেবল অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত শক্তিশালী একটি উপাদান । প্রশাসন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতিটি ক্ষেত্রেই তথ্যের ওপর নির্ভরতা দিন দিন গভীর হচ্ছে।
একটি দেশের নীতিনির্ধারণে, উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কিংবা জনসংখ্যাগত পরিবর্তন বিশ্লেষণে তথ্য অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে—যেমন, মহামারির সময় মানুষের চলাচল ও সংক্রমণের হার বিশ্লেষণ করে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কোন এলাকায় লকডাউন দিতে হবে, কোথায় হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একইভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ, শিল্পকারখানায় উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং কৃষিখাতে বৃষ্টিপাত বা মাটির উর্বরতা বিশ্লেষণ—সব ক্ষেত্রেই বাস্তব তথ্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে । ফলে যাদের কাছে যত বেশি নির্ভুল তথ্য থাকে, তারা তত বেশি সফলভাবে ভবিষ্যৎকে পরিচালনা করতে পারবে।
প্রযুক্তিবিদ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী দিনের বিশ্ব সম্পূর্ণভাবে তথ্যনির্ভর প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে। স্বয়ংচালিত গাড়ি, স্মার্ট সিটি, রোবটিক্স, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, ডিজিটাল ফাইন্যান্স—সব কিছুর ভিত্তি হলো তথ্য। স্বয়ংচালিত যানবাহন চলার সময় কোটি কোটি সেন্সর ডেটা বিশ্লেষণ করে পথ নির্ধারণ করে । স্মার্ট সিটিতে মানুষের চলাচল, বিদ্যুৎ ব্যবহার, যানজট, পরিবেশদূষণ—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে শহর পরিচালনা সহজ হয় । আবার এআইনির্ভর স্বাস্থ্য-প্রযুক্তিতে রোগীর আগের মেডিক্যাল তথ্য বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়, যা ভবিষ্যতে আরো নির্ভুল হবে । কোয়ান্টাম কম্পিউটার বিশাল ডেটাসেট দ্রুত বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা, মহাকাশ, আবহাওয়া পূর্বাভাসসহ সব ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাবে। তাই যার কাছে তথ্য থাকবে, সেই হবে প্রযুক্তিভিত্তিক ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মালিক । কারণ, এটি প্রযুক্তি, সমাজ, অর্থনীতি এবং মানবজীবনের প্রতিটি খাতকে পরিচালনা করবে।
তথ্যের গুরুত্বকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনার প্রধান কারণ হলো, এটি মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজ ও কার্যকর করে তোলে । একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাবসায়িক কৌশল অথবা একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার মান সব কিছুতেই তথ্যের যুক্তিযুক্ত ব্যবহার উন্নয়নের পথ তৈরি করে। আজকের বিশ্বে ‘ডেটা ইজ দ্য নিউ অয়েল’—এই কথাটি তথ্যের প্রকৃত মূল্যই তুলে ধরে। যেসব প্রতিষ্ঠান তথ্যকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারে, তারা বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে এবং উদ্ভাবনে সক্ষম হয় । সুতরাং তথ্যের ব্যবহার সমাজকে আরো সংগঠিত, স্মার্ট এবং সফল করে তোলে।
ভবিষ্যৎ বিশ্বে তথ্য একদিকে যেমন সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে, অন্যদিকে এর অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে না পারলে এটি মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে; তথ্যের অপব্যবহার, সাইবার আক্রমণ, পরিচয় চুরি, ভুয়া তথ্য ছড়ানো— সবই আধুনিক সমাজের জন্য বড় হুমকি। তাই তথ্যের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, যে তথ্য মানুষকে ক্ষমতাবান করে, সেই তথ্যই সঠিক নিরাপত্তা না থাকলে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই আধুনিক যুগে তথ্যকে একদিকে সম্পদ, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান উভয়ভাবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন । এর কারণ, এই মূল্যবান সম্পদটিই যখন ভুল হাতে পড়বে, তখন তা বিশাল ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে ।
তথ্য চুরি, ডেটা ব্রিচ, সাইবার আক্রমণ, পরিচয় জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা, এসবের মূলে থাকে তথ্যের অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা । ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হলে মানুষের গোপনীয়তা বিপন্ন হয়, আর রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হলে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে ৷ অনেক সময় ভুল তথ্য বা ভুয়া সংবাদ ছড়িয়ে সামাজিক অস্থিরতা, গুজব বা সহিংসতা পর্যন্ত সৃষ্টি হয়। তাই তথ্যের অপব্যবহার সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করতে পারে ।
তথ্যের এই দ্বিমুখী চরিত্র আমাদেরকে আরো সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দেয় । আর তাই তথ্য ব্যবহারের পাশাপাশি এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা, ডেটা এনক্রিপশন, নিরাপদ পাসওয়ার্ড, সচেতন ব্যবহারকারীর আচরণ—এসবই তথ্যকে ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদের উচিত, যে কোনো তথ্য কোথা থেকে এসেছে, কতটা সত্য এবং তা শেয়ার করলে কারো ক্ষতি হতে পারে কি না—এসব বিষয় ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া । তথ্য একই সঙ্গে আশীর্বাদ এবং সম্ভাব্য বিপদের উৎস—এ কথা সব সময় স্মরণ রাখতে হবে। এর ইতিবাচক ব্যবহার আমাদের জ্ঞান, ক্ষমতা ও উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে, আর অবহেলাজনিত ভুল ব্যবস্থাপনা আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনহুমকিস্বরূপ। তাই তথ্য ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য, সচেতনতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাই আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ । তথ্য যত মূল্যবান সম্পদ, ঠিক ততটাই এটি ঝুঁকিপূর্ণ, আর সেই দুইয়ের মধ্যেই রয়েছে আমাদের বুদ্ধিমত্তা, দায়িত্বশীলতাও নিরাপদ অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তি ।