ফিচার ডেস্ক,সংবাদ এই সময়।
সাধারণ বীজ-কাগজ থেকে বনকাগজ আলাদা। সাধারণত বীজ-কাগজে এক ধরনের শস্যের বীজ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বনকাগজে সর্বনিম্ন পাঁচ থেকে ছয় ধরনের শস্যের বীজ থাকে। এটি যে মাটিতে ফেলা হবে, সেখানে যেন একটি বৈচিত্র্যময় ‘বন’ সৃষ্টি হয়—এটাই তাদের দর্শন।
অঙ্কুরিত বনকাগজ।
‘আমাদের দেশের মানুষকে জৈব কৃষির নতুন গল্প শোনানোর জন্য একটি “ওয়ার্কিং টুল” দরকার ছিল। সেজন্য আমরা একটা কাগজ তৈরি করলাম, নাম দিলাম “বনকাগজ”। বনকাগজের ভেতরে আমরা সর্বোচ্চ ১৬ জাতের অর্গানিক (জৈব) বীজ দিলাম। এর মাধ্যমে আমরা বলতে চেয়েছি যে, এক টুকরো জমিতে বহু জাতের গাছ বা শস্য জন্মাবে এবং প্রতিটি গাছ একে অপরের সাহায্য নিয়ে বেড়ে উঠবে। জমিতে আগাছা বলতে কিছু থাকবে না। জৈব কৃষিতে কোনো ধরনের সার বা কীটনাশকের প্রয়োজন হবে না,’ বলছিলেন মাহবুব সুমন।
‘সিড পেপার’ বা বীজ-কাগজ বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় একটি হস্তশিল্প। নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমা পরিবেশবাদীরা বীজ-কাগজের ধারণা নিয়ে আসেন। যেকোনো ধরনের পুরোনো কাগজ রিসাইকেল (পুনরুৎপাদন) করার সময় তাতে গাছের বীজ মিশিয়ে দেওয়া হয়। সেই কাগজ ব্যবহারের পর মাটিতে বপন করলে জন্ম নেয় গাছ।
আমাদের দেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে বীজ-কাগজ বানিয়ে বিক্রি করে। তবে বাণিজ্যিকভাবে বীজ-কাগজের সবচেয়ে বড় বাজার তৈরি করেছেন মাহবুব সুমন। তার প্রতিষ্ঠান ‘শালবৃক্ষ’ থেকে উৎপাদন করা হয় ‘বনকাগজ’। সাধারণ বীজ-কাগজ থেকে বনকাগজ আলাদা। সাধারণত বীজ-কাগজে এক ধরনের শস্যের বীজ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বনকাগজে সর্বনিম্ন পাঁচ থেকে ছয় ধরনের শস্যের বীজ থাকে। এটি যে মাটিতে ফেলা হবে, সেখানে যেন একটি বৈচিত্র্যময় ‘বন’ সৃষ্টি হয়—এটাই তাদের দর্শন।
বনকাগজ আমাদের দেশে দিনদিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ভিজিটিং কার্ড, বিয়ের কার্ড, ইভেন্ট কার্ড বা লিফলেট—সবই তৈরি করা যায় এই বিশেষ কাগজ দিয়ে। সামনে জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনের প্রচারণার জন্য কয়েকজন প্রার্থী বনকাগজে প্রচারণা পত্র তৈরি করছেন। এদের মধ্যে অন্যতম বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। তারেক রহমানের দুটি নির্বাচনি আসন ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬-এর প্রচারণার জন্য বনকাগজ বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রচারণার পর এই কাগজ মাটিতে ফেলে দিলে তা থেকে জন্মাবে শীতকালীন বিভিন্ন শাকসবজি; যেমন: টমেটো, বেগুন, মরিচ, ডাঁটাশাক ইত্যাদি।
বনকাগজে প্রচারণাপত্র বানিয়ে নিজ এলাকায় বিতরণ করেছেন বলে জানান মাহবুব সুমন। এ ছাড়া ঢাকা-১৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনির প্রচারণাপত্র বানানো হয়েছে বনকাগজ দিয়ে। কিছুদিন আগে হওয়া ডাকসু নির্বাচনে ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ প্যানেল থেকে জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থী মেঘমল্লার বসুও বনকাগজের লিফলেট বিলি করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।
নবায়নযোগ্য শক্তি ও রিসাইকেল পণ্য নিয়ে কাজ করে মাহবুব সুমনের প্রতিষ্ঠান ‘শালবৃক্ষ’। বনকাগজ শালবৃক্ষের একটি উদ্যোগ। বনকাগজের মতো আরও নয়টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে শালবৃক্ষের অধীনে, যার সবগুলোই নবায়নযোগ্য শক্তি ও রিসাইকেল নিয়ে কাজ করে। মাহবুব সুমনের শালবৃক্ষ ও বনকাগজ নিয়েই আজকের আয়োজন।
প্রকৌশলী থেকে পরিবেশবিদ হওয়ার যাত্রা
মাহবুব সুমনের জন্ম নোয়াখালীতে হলেও বড় হয়েছেন ঢাকায়। তড়িৎ প্রকৌশল (ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) নিয়ে পড়াশোনা করেছেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) থেকে। এরপর তিনি নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য বিদেশে যান। প্রথমে জার্মানিতে গিয়ে ‘ওয়েস্ট এনার্জি’ (বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন) ও সোলার এনার্জি (সৌরবিদ্যুৎ) নিয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর ভারতে গিয়ে ‘উইন্ড এনার্জি’ (বায়ুশক্তি) ও উইন্ড টারবাইন নিয়ে পড়াশোনা করেন।
দীর্ঘদিন দেশের একটি টেলিকম কোম্পানিতে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। এরপর কাজ করেছেন সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে। দেশে উইন্ড টারবাইন নিয়ে যত কাজ হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম গাজীপুরের উইন্ড টারবাইন প্রকল্প। সেখানকার পুরো প্রকল্পটি মাহবুব সুমন সম্পন্ন করেছেন। বাংলাদেশে বায়ুশক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মাহবুব সুমনের নাম প্রথম সারিতেই থাকবে।
ছোটবেলা থেকেই জলবায়ু নিয়ে মাহবুবের প্রবল আগ্রহ ছিল। তিনি বলেন, ‘আমার দাদাবাড়ি ও নানাবাড়ি নোয়াখালীতে। ছোটবেলায় পত্রিকায় পড়তাম, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে একদিন দেশের উপকূলীয় অঞ্চল তলিয়ে যাবে। আমার দাদা-নানা, বাবা-মায়ের স্মৃতিবিজড়িত গ্রামের বাড়ি ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রের নিচে চলে যেতে পারে; এই ভাবনা আমাকে খুব কষ্ট দিত। পরিবেশের জন্য কিছু করার আগ্রহ তখন থেকেই জন্মায়।’
মাহবুব সুমন
পরবর্তীতে তড়িৎ প্রকৌশল পড়ার সময় মাহবুব জানতে পারেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশ দূষণ। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে কার্বন নিঃসরণ হয়। আর এর সেরা বিকল্প হলো নবায়নযোগ্য শক্তি। এ কারণেই তিনি এই বিষয়ে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার গড়েছেন। এই দীর্ঘ যাত্রায় প্রথম থেকেই তার সঙ্গী ছিলেন স্ত্রী ইকরামুন্নেসা চম্পা।
শালবৃক্ষের শুরু
২০১৯ সালে মাহবুব সুমন ও ইকরামুন্নেসা চম্পা মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘শালবৃক্ষ’। এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে কৃষি ও নবায়নযোগ্য শক্তির বিভিন্ন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা হয়। প্রাত্যহিক জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে বিকল্প ও পচনশীল পণ্য এবং প্রযুক্তির উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। মাহবুব জানান, শালবৃক্ষকে একটি ‘মাতৃ-সংগঠন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর অধীনে বর্তমানে ১০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এই ১০টি প্রতিষ্ঠানকে ‘কোম্পানি’ না বলে ‘সামাজিক উদ্যোগ’ বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন মাহবুব সুমন। এই উদ্যোগগুলো হলো—রিনিউএবল এনার্জি সার্ভিস (আরইএস), বনকাগজ, পলকা, নোয়াহকেম, ইকোপ্যাক, আলো প্রজেক্ট, ক্লাইমেট টেকনোলজি এডুকেশন অ্যান্ড অন্ট্রাপ্রেনারশিপ (সিটিইই), ব্যামবাক (বাঁশের তৈরি কাঠের বিকল্প পণ্য), ভিন্দুর মাতঙ্গি (বায়ুশক্তি থেকে বিদ্যুৎ) ও মার্চ এগেইন্সট প্লাস্টিক (ম্যাপ)।
আরইএস-এ সৌরবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও সামুদ্রিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ—এই চারটি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা হয়। ‘পলকা’ একটি পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক উপাদান, যা প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্য তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান ব্যবহার করে এটি তৈরি করা হয়। বর্তমানে এই কাঁচামাল দিয়ে প্লাস্টিকভিত্তিক প্যাকেজিং ও পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানারের বিকল্প উৎপাদন করা হচ্ছে। পলকা থেকে উৎপাদিত পণ্য শতভাগ বিষমুক্ত, নিরাপদ ও দ্রুত পচনশীল।
‘নোয়াহকেম’ হলো টয়লেট্রিজ পণ্যের উদ্যোগ। আমাদের নিত্যব্যবহার্য টুথপেস্ট, ফ্লোর ক্লিনার, সাবান কিংবা কীটনাশক তৈরিতে যেসব রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়, তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। নোয়াহকেমে এসব পণ্য বিষমুক্ত রাসায়নিক দিয়ে তৈরি করা হয়।
‘ইকোপ্যাক’ থেকে পলকা ও অন্যান্য পচনশীল কাঁচামাল ব্যবহার করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং সরবরাহ করা হয়। এটি পলিথিনের বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখছে।
‘আলো প্রজেক্ট’ কাজ করে নগর-কৃষি ও নগরের প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা নিয়ে। শহরের পরিবারগুলোকে নিজের বাসায় ক্ষুদ্র পরিসরে শস্য উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করে এই প্রজেক্ট। এখান থেকে বীজ, মাটি, কাঠের বেড ও জৈব সার সরবরাহ করা হয়। এর ফলে নতুন প্রজন্ম (জেন-জি) জানতে পারছে তাদের খাদ্য কীভাবে উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া এই প্রজেক্টের পক্ষ থেকে ঢাকা শহরের বিভিন্ন গাছে পাখির বাসা বসিয়ে দেওয়া হয়, যাতে করে শহর থেকে পাখি বিলুপ্ত না হয়ে যায়।।
সিটিইই পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় শালবৃক্ষের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলো সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে কাজ করে। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, করপোরেট ও এনজিওর সঙ্গে কাজ করে।
মাহবুব সুমন বলেন, ‘২০২৪-এর বন্যায় আপনারা দেখেছেন সারাদেশে মানুষ ত্রাণ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আমরা গিয়েছিলাম আমাদের বিভিন্ন উদ্ভাবন নিয়ে। সে সময় দুর্গম অঞ্চলে নেটওয়ার্ক কাজ করছিল না। আমাদের ‘জিএসএম ফোরজি নেটওয়ার্ক বুস্টার’ ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল করা সম্ভব হয়েছিল। এ ছাড়া আমাদের ভাসমান টয়লেট ও ড্রাম-নৌকাও বন্যার সময় কাজে লেগেছে।’
সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষেরা সুপেয় পানির তীব্র সংকটে ভোগেন। পানির লবণাক্ততা নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাদের জন্য সিটিইই-এর উদ্যোগে মাহবুব সুমন আবিষ্কার করেছেন ‘বাতাস থেকে পানি তৈরির যন্ত্র’। এই যন্ত্র দিয়ে গ্রীষ্মকালে দৈনিক ১০০ লিটার এবং শীতকালে ৬০ লিটার সুপেয় পানি পাওয়া সম্ভব।
‘ব্যামবাক’ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০২২ সালে। প্লাস্টিকের বিকল্প ও বৃক্ষ নিধন কমাতে বাঁশের ব্যবহার বাড়ানোই এর লক্ষ্য। গৃহনির্মাণ, আসবাবপত্র ও তৈজসপত্র তৈরিতে তারা অসংখ্য গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। ‘ভিন্দুর মাতঙ্গী’ কাজ করছে ডমেস্টিক উইন্ড টারবাইন নিয়ে, যাতে ঘরে ঘরে বায়ুশক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। ‘ম্যাপ’ কাজ করছে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা তৈরিতে। বর্তমানে দেশের চারটি জেলায় এর কার্যক্রম চলছে।
যেভাবে তৈরি হয় বনকাগজ
বনকাগজের প্রধান উপাদান হলো এর বীজ। মৌসুমভেদে সবচেয়ে ভালো মানের বীজ সংগ্রহ করা হয়। এতে কোনো হাইব্রিড বীজ ব্যবহার করা হয় না। সবজি, ফুল ও বৃক্ষের বীজ দিয়েই তৈরি হয় এই কাগজ। লালশাক, ডাঁটাশাক, কলমিশাক, টমেটো, বেগুন, কাঁচামরিচ, লেটুস, ক্যাপসিকাম—এসব সবজির বীজ থাকে বনকাগজে।
প্রথমে বাতিল ও পুরোনো কাগজ সংগ্রহ করে কুচিকুচি করা হয়।
প্রথমে ফেলে দেওয়া বা বাতিল কাগজ সংগ্রহ করে কুচিকুচি করে কেটে পানিতে ভিজিয়ে মণ্ড তৈরি করা হয়। পরে ব্লেন্ডারে সেই মণ্ডকে মিহি করা হয়। জিএসএম অনুযায়ী মণ্ডে পানির অনুপাত নির্দিষ্ট করা হয়। বনকাগজ সাধারণত ২১০ থেকে ২৪০ জিএসএমের হয়। এরপর ফ্রেমিং ট্যাংকে নিয়ে সাধারণত এ৩ আকারে কাগজ বানানো হয়।
ফ্রেম থেকে তোলার পর ‘সল্ট শেকার’-এর সাহায্যে কাগজের ওপর বীজ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অন্য বীজ-কাগজে নির্দিষ্ট সংখ্যায় বীজ দেওয়া হলেও বনকাগজে বীজের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে।
তবে কাজ এখানেই শেষ নয়; এরপর শুরু হয় শুকানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সাধারণ হাতে তৈরি কাগজ রোদে শুকানো গেলেও বনকাগজ শুকানো হয় বিশেষ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা ঠিক না থাকলে বীজ নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। তাই রুমের আদর্শ তাপমাত্রা রাখা হয় ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
প্রথমে একটি কাঁচের টেবিলে হালকা তাপে তিন ঘণ্টা এবং পরে ড্রাইং শেলফে আরও তিন ঘণ্টা বাতাসে শুকানো হয়। শুকানোর পর ‘স্ক্রু প্রেশার’ যন্ত্রে হালকা চাপ দেওয়া হয় সব কাগজে। এ সময় খুব সাবধান থাকতে হয়, কারণ একটি কাগজ নষ্ট হওয়া মানে প্রায় ২৫০ টাকার ক্ষতি।
সব প্রক্রিয়া শেষে ১০০টি করে বান্ডিল করা হয়। সর্বনিম্ন ১০০ পিস এ৩ আকারের কাগজ অর্ডার দেওয়া যায়, যার দাম পড়ে ২৫ হাজার টাকা (প্রতি পিস ২৫০ টাকা)। একটি এ৩ আকারের বনকাগজ থেকে ৩০টি ভিজিটিং কার্ড বা ৬-৮টি বিয়ের কার্ড তৈরি সম্ভব। সাধারণ প্রিন্টিং মেশিনে এই কাগজ ছাপালে বীজ নষ্ট হতে পারে, তাই ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু দোকানের কর্মচারীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়েছেন মাহবুব সুমন।
বনকাগজ থেকে চারা উৎপাদনের প্রক্রিয়া খুব সহজ। কাগজটি ছিঁড়ে ভেজা মাটিতে ফেললে এবং নিয়মিত যত্ন নিলে কয়েক দিনের মধ্যেই চারা গজাবে। সঠিকভাবে রোপণ করতে পারলে বীজ কাগজের অঙ্কুরোদগমের হার ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়।
ভবিষ্যৎ ভাবনা
১৯৮০-এর দশকে পরিবেশবাদীদের হাত ধরে বীজ-কাগজ বাজারে আসে এবং ১৯৯৫ সালে বাণিজ্যিকভাবে এর ব্যবহার শুরু হয়। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বীজ-কাগজ ব্যবহারের ফলে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার ৫০০ টন কাগজের বর্জ্য ল্যান্ডফিলে যাওয়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে।
২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বীজ-কাগজের বাজারমূল্য প্রায় ১৪৪ মিলিয়ন ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দশ বছরে বার্ষিক ২.৭০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩৪ সাল নাগাদ এটি ২১৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। এই প্রবৃদ্ধিতে ভারত ও চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভারতে এই বাজারের বার্ষিক বৃদ্ধির হার ৫.৭ শতাংশ এবং চীনে ৫.১ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং কানাডাতেও এর চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মাহবুব সুমন বলেন, ‘বনকাগজ একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। আপনার হাতে আসলে আপনি এটি নিয়ে ভাববেন, নেড়ে-চেড়ে দেখবেন, হাত দিয়ে বীজ গুলো অনুভব করবেন আর আশেপাশের মানুষকে এটি দেখাতেও পারবেন। কারণ জিনিসটা ইউনিক! বেশিরভাগ মানুষই কাগজটি মাটিতে রোপণ করেন। এই যে মানুষ পরিবেশ নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবছে—এটাই আমরা চাই।’
শালবৃক্ষ নিয়ে মাহবুব সুমন ও ইকরামুন্নেসা চম্পা অনেক বড় স্বপ্ন দেখেন। তারা চান আগামী দশ বছরের মধ্যে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুসংস্থানকে অন্তত কিছুটা হলেও আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে। আর সেই পরিবর্তনের অগ্রনায়ক হিসেবে থাকবে শালবৃক্ষ।