উমংনু মারমা
বান্দরবান প্রতিনিধি
পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে, আধুনিকতার কোলাহল থেকে অনেক দূরে এক নিভৃত জনপদ—মুনথার পাড়া। রোয়াংছড়ি উপজেলার এই পাহাড়ি গ্রামে এখনো পৌঁছায়নি উন্নয়নের ছোঁয়া। বিদ্যুৎ, পাকা সড়ক কিংবা আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা—সবই যেন এখানকার মানুষের কাছে দূরের গল্প। তবু জীবন থেমে নেই। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে, নিজেদের মতো করেই বেঁচে থাকার পথ তৈরি করে নিয়েছেন এখানকার মানুষ। তাদের দৈনন্দিন জীবনের ভরসা—ঝুড়ি আর কলস।
ভোরের আলো ফুটতেই পাহাড়ি নারী-পুরুষেরা নেমে পড়েন কাজে। কেউ বাঁশ কেটে আনেন গভীর জঙ্গল থেকে, কেউবা বসেন ঝুড়ি বোনার কাজে। আবার কেউ কলস কাঁধে নিয়ে পাড়ি জমান পাহাড়ি ঝিরির পথে, বিশুদ্ধ পানির সন্ধানে। আধুনিক পানির কল কিংবা মোটরচালিত পাম্প এখানে কল্পনামাত্র। শত বছর ধরে চলে আসা এই জীবনযাপনেই অভ্যস্ত তারা।
পাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা মংচিং মারমা বলেন, “আমরা ঝুড়ি বানাই, বাজারে বিক্রি করি। এই দিয়েই চাল-ডাল কিনি। কলস ছাড়া পানিও আনা যায় না। আমাদের জীবন এই দুইটার ওপরই চলে।” তার চোখেমুখে নেই কোনো অভিযোগ, আছে শুধু বাস্তবতার স্বীকৃতি।
ঝুড়ি আর কলস শুধু ব্যবহারিক সামগ্রী নয়, বরং পাহাড়ি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঁশের ঝুড়িতে বহন করা হয় ফসল, জ্বালানি কাঠ, এমনকি পাহাড়ি বাজারের পণ্যও। কলস ব্যবহৃত হয় পানি সংগ্রহে, রান্নায় ও দৈনন্দিন কাজে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই দক্ষতা উত্তরাধিকারসূত্রে শিখে আসছেন পাহাড়ি নারীরা।
পাড়ার এক গৃহবধূ চিংমা মারমা জানান, “আমাদের মেয়েরা ছোটবেলা থেকেই ঝুড়ি বোনা শেখে। এতে সংসারের কিছু টাকা আসে। বাইরে কাজের সুযোগ নেই, তাই এটাই ভরসা।”
তবে এই জীবনযাত্রা যতটা ঐতিহ্যবাহী, ততটাই কঠিন। শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধার অভাব এখানে প্রকট। বর্ষাকালে পাহাড়ি পথে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন ঝুড়ি-কাঁধে বা কলস হাতে পথ চলাই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।
স্থানীয়দের আশা, একদিন উন্নয়ন আসবে এই পাহাড়ি পাড়াতেও। তবে তারা চান না তাদের সংস্কৃতি হারিয়ে যাক। আধুনিক সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ঐতিহ্যও টিকে থাকুক—এটাই তাদের প্রত্যাশা।
উন্নয়নের আলো যেখানে এখনো পৌঁছায়নি, সেখানে মুনথার পাড়ার মানুষের জীবনযুদ্ধ চলে ঝুড়ি আর কলসকে সঙ্গী করে। পাহাড়ের নীরবতায়, প্রকৃতির কোলে দাঁড়িয়ে থাকা এই জনপদ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নয়, মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে সম্মান করাও সমান জরুরি।